ঢাকার গণপরিবহনব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফেরাতে শুধু বাসের রং বদল নয়, দরকার পরিকল্পনা, প্রযুক্তি, ব্যবস্থাপনা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা।
ঢাকার রাস্তায় বাসের রং বদলেছে, কিন্তু যাত্রীদের দুর্ভোগ কি বদলেছে? বাসের গায়ে নতুন রং, নতুন নাম কিংবা কোম্পানির পরিচয় লাগালেই কি গণপরিবহনব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরে আসবে?
১ নভেম্বর ঢাকায় কোম্পানিভিত্তিক বাস পরিচালনার নতুন উদ্যোগ শুরু হয়েছে। দীর্ঘদিনের বাস রুট রেশনালাইজেশন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ছয়টি রুটে এই ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। লক্ষ্য, প্রতিযোগিতামূলক বাস চলাচল বন্ধ করে নির্ধারিত রুটে শৃঙ্খল পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলা।
কিন্তু উদ্বোধনের পর থেকেই প্রশ্ন উঠছে, প্রস্তুতি ও পরিকল্পনার ঘাটতি নিয়ে। পুরোনো বাস দিয়েই কার্যক্রম শুরু হয়েছে, কিছু বাসের রং পরিবর্তন সম্পন্ন হয়নি, কোথাও রুট বরাদ্দ নিয়ে বিরোধ রয়েছে। ফলে নতুন ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।
সমস্যার শিকড় কোথায়?
ঢাকার গণপরিবহন সমস্যার পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং দুর্বল নিয়ন্ত্রণ।
– ঢাকায় ৪১৮টি অনুমোদিত বাস রুটের মধ্যে মাত্র ৯৮টি রুটে বাস চলাচল করছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তথ্য।
– প্রায় ৭ হাজার ৫০০ বাস পরিচালনা করছে ৬৬টি কোম্পানি।
– একই রুটে একাধিক পরিবহন কোম্পানির বাস চলাচল যাত্রী তোলার প্রতিযোগিতা বাড়াচ্ছে।
– যেখানে-সেখানে বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠানামা যানজট ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি করছে।
– চালকদের ট্রিপ ও আয় বাড়ানোর প্রতিযোগিতা সড়কে বিশৃঙ্খলা বাড়াচ্ছে।
– রাজনৈতিক বিবেচনায় রুট অনুমোদন এবং পরিবহন খাতের স্বার্থসংশ্লিষ্টতা কার্যকর সংস্কারের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ঢাকার সড়কব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে এমন এক প্রতিযোগিতামূলক পরিবহন সংস্কৃতির মধ্যে আটকে আছে, যেখানে যাত্রীসেবার চেয়ে যাত্রী সংগ্রহই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

কোম্পানিভিত্তিক বাস পরিচালনা কেন জরুরি?
বাস রুট রেশনালাইজেশনের মূল উদ্দেশ্য শুধু বাসের পরিচয় পরিবর্তন নয়, বরং একটি সমন্বিত পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলা।
– নির্ধারিত রুটে নির্দিষ্ট কোম্পানির বাস পরিচালনা।
– একই রুটে অতিরিক্ত বাসের প্রতিযোগিতা কমানো।
– নির্দিষ্ট স্টপেজে যাত্রী ওঠানামা নিশ্চিত করা।
– সমন্বিত টিকিট ও ভাড়া ব্যবস্থাপনা চালু করা।
– জিপিএসের মাধ্যমে বাসের চলাচল পর্যবেক্ষণ।
– যাত্রীসেবার মান, নিরাপত্তা ও সময়ানুবর্তিতা নিশ্চিত করা।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঢাকার বর্তমানে চালু থাকা ৯৮টি বাস রুটকে পর্যায়ক্রমে ৩২টি সমন্বিত রুটে আনার লক্ষ্য রয়েছে। প্রতিটি রুটে নির্দিষ্ট কোম্পানি বাস পরিচালনা করবে। এতে বাসের সংখ্যা, চলাচল ও ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণ সহজ হওয়ার কথা।
তবে রুট কমানো মানেই যাত্রীর দুর্ভোগ কমানো নয়। কোনো যাত্রীকে গন্তব্যে পৌঁছাতে একাধিক বাস পরিবর্তন করতে হলে ভাড়া, সময় ও যাতায়াতের সুবিধা বিবেচনায় রাখতে হবে।
আগের উদ্যোগগুলো কেন ব্যর্থ হয়েছে?
ঢাকায় বাস রুট রেশনালাইজেশন নতুন কোনো ধারণা নয়। ২০১৫ সালে তৎকালীন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আনিসুল হক বাস রুটগুলোকে কয়েকটি করিডরে ভাগ করে নির্দিষ্ট রঙের বাস পরিচালনার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর সেই উদ্যোগ থমকে যায়।
পরবর্তী সময়ে ২০২১ সালে ঘাটারচর থেকে সাইনবোর্ড রুটে ‘ঢাকা নগর পরিবহন’ পরীক্ষামূলকভাবে চালু হয়। কিন্তু অন্যান্য পরিবহন কোম্পানিকে একই ব্যবস্থায় আনা সম্ভব হয়নি। একপর্যায়ে উদ্যোগটি কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে।
এই অভিজ্ঞতা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে: পরিকল্পনা ভালো হলেও পরিবহন মালিক, শ্রমিক, প্রশাসন ও রাজনৈতিক পক্ষগুলোর সমন্বয় না থাকলে সংস্কার কতটা সম্ভব?
বারবার উদ্যোগ নেওয়া এবং মাঝপথে থেমে যাওয়া ঢাকার পরিবহন সংস্কারে ধারাবাহিকতার অভাবকে স্পষ্ট করে।
বাস্তবায়নে যেসব বিষয় করণীয়
নতুন ব্যবস্থার সফলতার জন্য কয়েকটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
– পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ বাস সরিয়ে পর্যায়ক্রমে মানসম্মত বাস চালু করা।
– চালক ও সহকারীদের প্রশিক্ষণ এবং পেশাগত আচরণ নিশ্চিত করা।
– নির্ধারিত স্টপেজ ও টিকিট কাউন্টার কার্যকর করা।
– ইলেকট্রনিক টিকিট ও সমন্বিত ভাড়া ব্যবস্থা চালু করা।
– জিপিএসভিত্তিক বাস চলাচল পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করা।
– বাসের ফিটনেস, রুট ও সময়সূচি নিয়মিত তদারকি করা।
– যাত্রীদের অভিযোগ ও প্রতিক্রিয়া মূল্যায়নের ব্যবস্থা রাখা।
বিশেষ করে বাসের কর্মীদের বেতনভিত্তিক নিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ। চালক ও সহকারীদের আয় যদি অতিরিক্ত ট্রিপ বা যাত্রী সংগ্রহের ওপর নির্ভর করে, তাহলে প্রতিযোগিতামূলক আচরণ বন্ধ করা কঠিন হবে। নির্ধারিত বেতন, কর্মঘণ্টা ও দায়িত্ব নিশ্চিত করা গেলে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর সুযোগ বাড়বে।

জবাবদিহি নিশ্চিত করাই সবচেয়ে জরুরী
নতুন ব্যবস্থা কার্যকর করতে শুধু নির্দেশনা নয়, বাস্তব প্রয়োগ জরুরি।
– বাসমালিক, পরিবহন কোম্পানি ও চালকদের দায়িত্ব নির্ধারণ।
– অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ।
– যাত্রীদের অভিযোগ জানানোর সহজ ব্যবস্থা।
– সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়মিত তদারকি।
– রুট বরাদ্দ ও কোম্পানি নির্বাচনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।
– রাজনৈতিক প্রভাব ও স্বার্থের সংঘাত থেকে পরিবহনব্যবস্থাকে মুক্ত রাখা।
একটি কোম্পানিকে নির্দিষ্ট রুটের দায়িত্ব দেওয়ার অর্থ তাকে একচ্ছত্র সুবিধা দেওয়া নয়। বরং যাত্রীসেবা, বাসের মান, সময়ানুবর্তিতা ও নিরাপত্তার ভিত্তিতে কোম্পানির কার্যক্রম মূল্যায়ন করতে হবে। ব্যর্থ হলে ব্যবস্থা নেওয়ার বিধানও থাকতে হবে।
পরিবহন সংস্কার মানেই নগর সংস্কার
ঢাকার গণপরিবহন সংস্কার কোনো বিচ্ছিন্ন প্রকল্প নয়। এটি নগর পরিকল্পনা, সড়ক ব্যবস্থাপনা, জনস্বার্থ এবং নাগরিকের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
বাসের রুট পরিবর্তন করলেই যানজট পুরোপুরি কমবে না। এর সঙ্গে প্রয়োজন ফুটপাত দখলমুক্ত করা, অবৈধ পার্কিং বন্ধ, সড়কের ধারণক্ষমতা অনুযায়ী যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ এবং গণপরিবহনের সঙ্গে মেট্রোরেল ও অন্যান্য পরিবহনব্যবস্থার সমন্বয়।
একই সঙ্গে ঢাকার চারটি আন্তজেলা বাস টার্মিনাল শহরের বাইরে স্থানান্তরের পরিকল্পনাও গুরুত্বপূর্ণ। গাবতলী, মহাখালী, সায়েদাবাদ ও ফুলবাড়িয়া টার্মিনালের চাপ কমানো গেলে নগরের অভ্যন্তরীণ যানজট নিয়ন্ত্রণে সহায়তা হতে পারে। তবে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে সময়, অর্থ ও কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন।
বাসের রং নয়, পরিবর্তন চাই বাস্তবে
ঢাকার মানুষ নতুন রঙের বাস দেখতে চায় না, তারা চায় সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছাতে, নিরাপদে যাতায়াত করতে এবং প্রতিদিনের যানজট থেকে মুক্তি পেতে।
বাস রুট রেশনালাইজেশন সফল হবে কি না, তার উত্তর বাসের গায়ে নয়, ঢাকার সড়কে দেখা যাবে।
নতুন উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে কত দ্রুত বাসের রং বদলানো হলো তার ওপর নয়, বরং কতটা বদলানো গেল পরিবহনব্যবস্থার পুরোনো সংস্কৃতি।


