ইনকিলাব মঞ্চের প্রতিষ্ঠাতা ও মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি হত্যা মামলার অধিকতর তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের শুনানি আজ। ৩৭ দিন পর মঙ্গলবার ঢাকার আদালতে মামলাটি আবার উঠছে। গত ২৭ সেপ্টেম্বর তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা থাকলেও তা দিতে পারেনি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
অধিকতর তদন্তের প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য এর আগে একাধিকবার সময় নিয়েছে তদন্ত সংস্থা। আদালত সূত্র ও মহানগর প্রসিকিউশন বিভাগ বলছে, প্রতিবেদন দাখিলের সময়সীমা এ নিয়ে প্রায় ২০ বার পেছানো হয়েছে। আজ সিআইডি প্রতিবেদন দেবে, নাকি আরও সময় চাইবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
মামলাটির অধিকতর তদন্তের দায়িত্বে আছেন সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার আবদুল কাদির ভূঞা। গত ২৭ সেপ্টেম্বর প্রতিবেদন জমা দিতে না পারায় ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জশিতা ইসলামের আদালত নতুন করে ৩ নভেম্বর দিন ঠিক করেন। এর আগে ২০ আগস্টও প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য ছিল।
হাদি হত্যার দ্রুত বিচার চেয়ে এরই মধ্যে সময়সীমা ঘোষণা করেছে ইনকিলাব মঞ্চ। সংগঠনটি আগামী ১৮ ডিসেম্বরের মধ্যে বিচার শেষ করার দাবি জানিয়েছে। ওই সময়ের মধ্যে বিচার না হলে কঠোর আন্দোলনে যাওয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন সংগঠনটির নেতারা।
মামলাটির তদন্ত শুরু করেছিল ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। গত ৬ জানুয়ারি ডিবির পরিদর্শক ফয়সাল আহমেদ ১৭ জনকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র দেন। এতে ফয়সাল করিম মাসুদকে প্রধান আসামি করা হয়। সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পীসহ আরও কয়েকজনের নামও অভিযোগপত্রে ছিল।
তবে ওই অভিযোগপত্রে আপত্তি জানান মামলার বাদী ও ইনকিলাব মঞ্চের তৎকালীন সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল জাবের। গত ১৫ জানুয়ারি তিনি আদালতে নারাজি আবেদন করেন। আদালত আবেদন গ্রহণ করে মামলাটি আরও তদন্তের নির্দেশ দেন। এরপর তদন্তের দায়িত্ব সিআইডির কাছে যায়।
ডিবির অভিযোগপত্রে বলা হয়েছিল, রাজনৈতিক বিরোধের জেরে হাদিকে হত্যা করা হয়। একই সঙ্গে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাধাগ্রস্ত করা এবং ভোটারদের মধ্যে ভয় তৈরি করাও হত্যার উদ্দেশ্যের অংশ ছিল বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়। এখন সিআইডির তদন্তে হত্যার পরিকল্পনা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিষয়ে নতুন কোনো তথ্য আসে কি না, সেটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তদন্তের সময় মামলার প্রধান আসামি ফয়সাল করিম মাসুদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত ফয়সাল রুবেল আহমেদকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাকে দুই দফায় মোট ১২ দিনের রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পরে তিনি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। এরপর তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর নির্বাচনী প্রচারণা শেষে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের দিকে যাচ্ছিলেন হাদি। দুপুর ২টা ২০ মিনিটের দিকে পল্টন মডেল থানার বক্স কালভার্ট এলাকায় তার অটোরিকশায় গুলি চালানো হয়। মোটরসাইকেলে থাকা দুর্বৃত্তরা হামলার পর ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়।
গুলিতে গুরুতর আহত হাদিকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে অস্ত্রোপচারের পর তাকে এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ১৫ ডিসেম্বর তাকে সিঙ্গাপুরে পাঠানো হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ ডিসেম্বর তাঁর মৃত্যু হয়।
এ ঘটনায় ১৪ ডিসেম্বর পল্টন মডেল থানায় হত্যাচেষ্টা মামলা করেন আবদুল্লাহ আল জাবের। হাদির মৃত্যুর পর মামলাটি হত্যা মামলায় রূপ নেয়। এরপর তদন্ত ও বিচারিক কার্যক্রম এগিয়ে নিতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হলেও অধিকতর তদন্ত প্রতিবেদন এখনো জমা পড়েনি।
বিচার দাবিতে কর্মসূচি
হাদি হত্যার বিচার দ্রুত শেষ করার দাবিতে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছে ইনকিলাব মঞ্চ। সংগঠনটি তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ পর্যন্ত ‘মার্চ ফর ইনসাফ’ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন এলাকায় পথসভা ও বিক্ষোভ মিছিল করছেন সংগঠনটির নেতাকর্মীরা।
ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক আবদুল্লাহ আল জাবের বলেছেন, আগামী ১৮ ডিসেম্বরের মধ্যে হাদি হত্যার বিচার নিশ্চিত করতে হবে। তিনি জানান, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তারা রাজপথে থাকবেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিচার না হলে কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন তিনি।
সংগঠনটির সূত্র জানিয়েছে, ‘মার্চ ফর ইনসাফ’ কর্মসূচি নিয়ে নেতাকর্মীরা বর্তমানে খাগড়াছড়িতে রয়েছেন। মঙ্গলবার হেয়াকো বাসস্ট্যান্ড, রামগড় ও মাটিরাঙ্গা হয়ে খাগড়াছড়ির হাদি চত্বরে কর্মসূচি পালনের কথা রয়েছে।
এখন মামলার পরবর্তী অগ্রগতি অনেকটাই নির্ভর করছে সিআইডির তদন্ত প্রতিবেদনের ওপর। প্রতিবেদন জমা পড়লে আদালত পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ ঠিক করবেন। আর প্রতিবেদন দিতে না পারলে তদন্তের জন্য আবারও সময় দেওয়া হবে কি না, আজকের শুনানিতে সেটিও স্পষ্ট হতে পারে।

