রক্তের ক্যানসারে আক্রান্ত ১৪ মাস বয়সী শিশু মিনহা রহমান রিদার চিকিৎসার জন্য মাত্র ১৩ ঘণ্টায় ৬২ লাখ টাকার বেশি সহায়তা এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাহায্যের আবেদনের পর দেশ ও প্রবাসের অসংখ্য মানুষ ছোট ছোট অঙ্কের টাকা পাঠিয়েছেন। সংগ্রহ দ্রুত বাড়তে থাকায় পরিবার নিজেই নতুন করে সহায়তা না পাঠানোর অনুরোধ জানায়। এই অর্থেই এখন রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে মিনহার চিকিৎসা চলছে।
মিনহার বয়স যখন ১১ মাস, তখন তার রক্তের ক্যানসার ধরা পড়ে। এরপর থেকে পরিবারের পুরো জীবনযাপনই বদলে গেছে। মা মালিহা মোবাকশ্বেরা এখন বেশির ভাগ সময় মেয়েকে নিয়ে হাসপাতালে থাকেন, নয়তো বিভিন্ন পরীক্ষার জন্য ছুটতে হয়। বাবা রোমান হোসেন নারায়ণগঞ্জের ভুলতায় একটি বেসরকারি কোম্পানিতে সিনিয়র এক্সিকিউটিভ পদে কাজ করেন। মেয়ের অসুস্থতার পর মালিহা তাকে নিয়ে রাজধানীর বনশ্রীতে নিজের মা ও ভাইয়ের বাসায় থাকছেন।

মালিহা জানান, বিয়ের পর পাঁচ বছর তিনি সন্তান নিতে পারেননি। দেশে ও ভারতে চিকিৎসা করিয়ে অবশেষে মা হন। গর্ভাবস্থায় তাঁর থাইরয়েড, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপসহ নানা জটিলতা ছিল। গত বছরের ২২ আগস্ট অস্ত্রোপচারে মিনহার জন্ম হয়। জন্মের সময় এবং পরে ১১ মাস বয়স পর্যন্ত সে সুস্থই ছিল, বড় কোনো সমস্যা দেখা যায়নি। এত অপেক্ষার পর পাওয়া সন্তানের এমন রোগ ধরা পড়ার খবর পরিবারের জন্য ছিল অপ্রত্যাশিত আঘাত।
পরিবারের বর্ণনায়, প্রথমে লক্ষণ ছিল সামান্য। মিনহা ঠিকমতো খেত না, ওজনও বাড়ছিল না। গত মে মাসে জ্বর আসে এবং কিছুদিন পর তা সেরেও যায়। পরে তার গলা ফুলে ওঠে। ৩১ জুলাই শ্বেত রক্তকণিকার পরীক্ষার প্রতিবেদন দেখে চিকিৎসক প্রথম রক্তের ক্যানসারের সন্দেহ করেন। ১ আগস্ট থেকেই চিকিৎসা শুরু হয়।
মিনহার মামা শাহাদাত জামান সৈকত জানান, চিকিৎসায় একটুও দেরি করা হয়নি। প্রথমে এক জায়গায় পরীক্ষা করানো হয়, পরে এভারকেয়ারে আবার পরীক্ষা করা হলে একই ফল আসে। হাসপাতালটি তখনই ভর্তির পরামর্শ দেয়। কিন্তু শুরুতেই যে খরচের কথা বলা হয়, তা মেটানোর মতো টাকা তখন পরিবারের হাতে ছিল না। তাই প্রাথমিকভাবে মিরপুরের আরেকটি হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা শুরু করা হয়।
শাহাদাত নিজে এ বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন। তাঁর ভাষ্য, শিশুদের এ ধরনের ক্যানসারের চিকিৎসায় সংক্রমণ এড়ানোর ওপর বারবার জোর দেওয়া হয়। এ কারণেই তিনি এভারকেয়ারে চিকিৎসা করানোর সিদ্ধান্ত নেন।
সহায়তার আবেদনের পেছনে ছিল আগের অভিজ্ঞতাও। শাহাদাত সামাজিক উদ্যোগ মজার স্কুলের সহপ্রতিষ্ঠাতা। দীর্ঘদিন স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করেছেন এবং বিভিন্ন মানুষকে আর্থিক সহায়তা পাইয়ে দিতে ভূমিকা রেখেছেন। একসময় যে বড় স্বেচ্ছাসেবী দলের সঙ্গে তিনি কাজ করতেন, সেই দলের সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করে মিনহার জন্য সহায়তা চাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। সবাই একমত হলে তিনি একটি ওয়েবসাইট চালু করেন এবং ফেসবুকে পোস্ট দেন। শাহাদাত জানান, পোস্টটি আবেগ দিয়ে লিখে দিয়েছিলেন হেরা অফেলিয়া লরেন, যাঁর সঙ্গে তাঁর বিয়ের কথা চলছে।
আন্তর্জাতিক অনুদান প্ল্যাটফর্ম গো ফান্ড মিতেও সহায়তা চাওয়ার ব্যবস্থা করেন কানাডাপ্রবাসী এক আত্মীয়, এহসান খান। মোট ৬২ লাখ টাকার মধ্যে সেখান থেকে এসেছে প্রায় ৩০ লাখ টাকা। অর্থাৎ সংগৃহীত অর্থের প্রায় অর্ধেকই এসেছে প্রবাস থেকে।
গত ৮ আগস্ট ফেসবুকে শাহাদাত জানান, ২৪ ঘণ্টা পার হওয়ার আগেই তাঁরা দেশ ও বিদেশ মিলিয়ে ৬২ লাখ ৪১ হাজার ৮৩৮ টাকা পেয়েছেন। সেই পোস্টে তিনি লেখেন, মিনহার জন্য তাঁরা একটি সমুদ্র চেয়েছিলেন এবং অল্প সময়েই সেই সমুদ্র তৈরি হয়ে গেছে। কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ভাষা তাঁদের নেই বলেও জানান।
শাহাদাত বলেন, মানুষ যে হারে টাকা পাঠাচ্ছিলেন, তাতে তাঁরা হতবাক হয়ে যান। এত টাকা সামলানোই কঠিন হয়ে পড়েছিল। তা ছাড়া চিকিৎসায় শেষ পর্যন্ত কত টাকা লাগবে, সেটাও তাঁদের জানা ছিল না। তবু প্রয়োজনের চেয়ে বেশি অর্থ নিতে চাননি বলে ১৩ ঘণ্টা পরেই আর সহায়তা লাগবে না বলে পোস্ট দেন।
মালিহা জানান, অনেকে ১০০ টাকা, ৫০০ টাকা কিংবা তারও কম অঙ্ক পাঠিয়েছেন। এসব ছোট ছোট সহায়তা মিলেই বড় অঙ্কে পৌঁছেছে। তিনি বলেন, চিকিৎসক যখন প্রথম ক্যানসারের কথা জানান, তখনই পরিবারের মাথায় খরচের দুশ্চিন্তা আসে। সোনার গয়না কতটুকু আছে, জমি কতটা বিক্রি করতে হবে, এসব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়ে গিয়েছিল। ফেসবুকে সাহায্য চাইলে মানুষ এভাবে এগিয়ে আসবেন, তা তিনি ভাবতেও পারেননি। তাঁর মতে, মানুষ পাশে না দাঁড়ালে মেয়ের উন্নত চিকিৎসা চালানো সম্ভব হতো না।
তবে টাকার অঙ্ক বড় দেখালেও চিকিৎসার পথ এখনো দীর্ঘ। এ পর্যন্ত চিকিৎসায় খরচ হয়েছে ৪০ লাখ টাকার বেশি। মালিহা জানান, চিকিৎসা চালাতে হবে অন্তত চার বছর। এই সময়ে সব মিলিয়ে কত টাকা লাগবে, তা এখনো পরিবারের অজানা। ফলে এখন পাওয়া অর্থ চিকিৎসার প্রথম ধাপের চাপ সামলাতে সহায়ক হলেও দীর্ঘমেয়াদি খরচের প্রশ্নটি রয়েই গেছে।
চিকিৎসার অগ্রগতি নিয়ে পরিবার আপাতত আশাবাদী। বিভিন্ন পরীক্ষার প্রতিবেদন অনুযায়ী, চিকিৎসা নির্ধারিত প্রটোকল মেনে সঠিক পথেই এগোচ্ছে। দেশে চলা চিকিৎসা ঠিক আছে কি না, তা যাচাই করতে মিনহাকে ভারতের একটি উন্নতমানের হাসপাতালেও নেওয়া হয়েছিল। সেখানকার চিকিৎসকেরাও জানিয়েছেন, বাংলাদেশে যে চিকিৎসা চলছে, তা যথাযথ।
এর মধ্যেই চিকিৎসার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ সামনে। গত মঙ্গলবার হাসপাতাল থেকে ফোন করে জানানো হয়, বুধবার মিনহার বুকে কেমো পোর্ট বসানো হবে। এর আগে একবার পোর্ট বসানো হলেও তা পরে কাজ করেনি। নতুন পোর্ট বসানোর পরই আবার কেমোথেরাপি শুরু হবে। শুধু এই পোর্ট বসাতেই খরচ ৫০ হাজার টাকা, এর সঙ্গে যোগ হবে আনুষঙ্গিক ব্যয়। মালিহা জানান, হাসপাতালে গেলে অনেক সময় মেয়ের শিরা পাওয়া যায় না, ক্যানুলা নষ্ট হয়ে যায় এবং মেয়ে চিৎকার করে কাঁদে। সবকিছু কঠিন হলেও এখন এটিই তাঁদের জীবনের অংশ বলে মেনে নিয়েছেন।
এত কিছুর মধ্যেও মিনহা পরিবারের সবার মন ভরিয়ে রাখছে। সে এখন দাঁড়াতে পারে, কিছু ধরে হাঁটার চেষ্টা করে। তার মুখে চারটি দাঁত উঠেছে, একটু পরপর সে হাসে। মা, বাবা ও মামা ডাকতেও শিখেছে। মালিহার ভাষায়, মেয়ের এই হাসি তিনি সারা জীবন দেখতে চান। ভবিষ্যতে প্রয়োজন হলে আবারও মানুষকে পাশে দাঁড়ানোর অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি। তাঁর একটাই চাওয়া, মেয়ে বেঁচে থাকুক এবং সুস্থভাবে বড় হোক।
ফেসবুকে সাহায্য চেয়ে অনেকেই আবেদন করেন, কিন্তু সবাই মিনহার মতো সাড়া পান না। এ প্রসঙ্গে শাহাদাত এটিকে মিনহার সৌভাগ্য বলেই মনে করেন। তবে তাঁর পর্যবেক্ষণ, অনলাইনে অর্থ পাঠানোর আগে মানুষ জানতে চান বিষয়টি আসল কি না, কতটা স্বচ্ছতা আছে এবং কেউ প্রতারণা করছে কি না। মিনহার ক্ষেত্রে ওয়েবসাইটে শিশুটির সব তথ্য খোলাখুলি দেওয়া ছিল এবং সেটি এখনো নিয়মিত হালনাগাদ করা হয়। এই স্বচ্ছতাই মানুষের আস্থা তৈরিতে বড় ভূমিকা রেখেছে বলে ধারণা করা যায়।

