চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন তরুণ উদ্যোক্তা অরূপ বণিক। বয়স ছিল মাত্র ২৬ বছর। অনলাইনে বই বিক্রির প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা এই তরুণের অকাল মৃত্যুতে পরিবার, বন্ধু ও এলাকাজুড়ে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। পরিবারের দাবি, ডেঙ্গুতেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে।
অরূপের বাড়ি মিরসরাই উপজেলার ওয়াহেদপুর ইউনিয়নের হাদিফকিরহাট এলাকায়। এক সপ্তাহ জ্বরে ভোগার পর বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় তিনি মারা যান। অসুস্থ শরীর নিয়ে ওই দিন বিকেলে ঢাকা থেকে বাড়িতে ফিরেছিলেন তিনি। বাড়িতে পৌঁছানোর এক ঘণ্টার মধ্যেই তাঁর অবস্থার অবনতি ঘটে। স্বজনেরা তাঁকে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত বলে ঘোষণা করেন। রাত ১১টার দিকে পারিবারিক শ্মশানে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।

ছেলের মৃত্যুর পর শোকে ভেঙে পড়েছেন বাবা অর্জুন বণিক। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, বারবার তাগাদা দেওয়া সত্ত্বেও ছেলে ঢাকা থেকে বাড়ি আসেনি। শেষ পর্যন্ত শরীর আর না কুলিয়ে ওঠায় বৃহস্পতিবার বিকেলে সে বাড়ি ফেরে। বাস থেকে নামার পর ছেলেকে জড়িয়ে ধরে কোনোমতে বাড়িতে এনেছিলেন বলে জানান তিনি। অর্জুন বণিকের ভাষ্য, এখন মনে হচ্ছে বাবা-মা ও স্বজনদের শুধু একনজর দেখতেই অরূপ বাড়িতে এসেছিল। বিলাপ করে তিনি বলেন, এমন সোনার টুকরো ছেলেকে ডেঙ্গু কেড়ে নিয়েছে, এখন তিনি কী নিয়ে বাঁচবেন।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, দুই সপ্তাহ আগে পরিবারের সবাই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন। তাঁদের সেবা-শুশ্রূষার জন্য ঢাকা থেকে বাড়িতে ছুটে আসেন অরূপ। সবাই কিছুটা সুস্থ হলে তিনি আবার ঢাকায় ফিরে যান। এরপরই তাঁর জ্বর আসে। শরীরব্যথাসহ ডেঙ্গুর সব উপসর্গ ছিল তাঁর মধ্যে।
অরূপ ছিলেন বাবা-মায়ের দুই মেয়ে ও এক ছেলের মধ্যে সবার ছোট। বৃহস্পতিবার রাতে তাঁদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, মরদেহের পাশে বসে কাঁদছেন দুই বোন। বন্ধুরাও ছুটে এসেছেন সেখানে। কেউ হাউমাউ করে কাঁদছেন, কেউ স্মৃতিচারণায় ডুবে আছেন।
স্বজন ও বন্ধুদের তথ্য অনুযায়ী, অরূপ সরকারহাট এনআর উচ্চবিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক এবং মিরসরাইয়ের প্রফেসর কামাল উদ্দিন চৌধুরী কলেজের ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। পরে ফেনীর জয়নাল হাজারী কলেজ থেকে স্নাতক (সম্মান) সম্পন্ন করেন।
ছোটবেলা থেকেই বই পড়তে ভালোবাসতেন অরূপ। সেই ভালোবাসা থেকেই ২০২০ সালে করোনাকালে ফেনী শহরের মাস্টারপাড়ায় দুই বন্ধু আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী ও অনিক বণিককে নিয়ে চালু করেন অনলাইন বইয়ের প্ল্যাটফর্ম ‘বইপাড়া ডটকম’। শুরুর পর অল্প সময়েই দেশের বিভিন্ন জেলার পাঠকদের কাছ থেকে ব্যাপক সাড়া পায় উদ্যোগটি।
দুই বছর পর ফেনী ছেড়ে কিছুদিন চট্টগ্রাম নগরে থেকে প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম এগিয়ে নেন অরূপ। একপর্যায়ে দুই বন্ধু এই কাজ থেকে সরে গেলেও তিনি একাই উদ্যোগটি চালিয়ে যান। ২০২৪ সালে অনলাইনের পাশাপাশি ঢাকার বাংলাবাজারে একটি বইয়ের দোকানও চালু করেন। পুরান ঢাকার একটি মেসে থেকে তিনি সেই ব্যবসা পরিচালনা করতেন। দোকানে দেশি-বিদেশি নানা ধরনের বই বিক্রি করতেন তিনি।
বন্ধু ও একই এলাকার বাসিন্দা মোস্তফা জানান, কিশোর বয়স থেকেই এলাকার নানা সামাজিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলেন অরূপ। মানুষের দুঃসময়ে পাশে দাঁড়াতে ভালোবাসতেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, বই পড়লে মানুষের ইতিবাচক পরিবর্তন আসে। এই ভাবনা থেকেই তিনি বই ছড়িয়ে দেওয়ার কাজে নিজেকে যুক্ত করেছিলেন।
অরূপের মৃত্যুর খবর পেয়ে রাতে ফেনী থেকে ছুটে আসেন বন্ধু ও ‘বইপাড়া ডটকম’-এর সহ-উদ্যোক্তা আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী। শেষকৃত্যের আগে তিনি বন্ধুর মরদেহ জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি জানান, করোনাকালে তিন বন্ধু মিলে প্ল্যাটফর্মটি শুরু করেছিলেন। সাহিত্যের বিভিন্ন শাখার পাশাপাশি দেশি-বিদেশি নানা বই বিক্রি করতেন তাঁরা। আর্থিক টানাপোড়েনের মধ্যেও অরূপ এই কাজ চালিয়ে গেছেন এবং এটিকেই জীবিকা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। বন্ধুর এভাবে চলে যাওয়া তিনি কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না।
একটি পরিবারের সবাই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়া এবং পরে পরিবারের কনিষ্ঠ সদস্যের মৃত্যু মনে করিয়ে দেয়, এই রোগকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। জ্বর ও শরীরব্যথার মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং পূর্ণ বিশ্রাম নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

