আগে থেকেই চড়া বিমান ভাড়ার দেশে নতুন করে চাপ বাড়ানোর ইঙ্গিত মিলেছে। বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) বেশ কিছু অ্যারোনটিক্যাল চার্জ (বিমান চলাচলসংক্রান্ত ফি) সর্বোচ্চ ৩৩ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর চিন্তা করছে। এ প্রস্তাব কার্যকর হলে এয়ারলাইনসগুলোর পরিচালন ব্যয় বাড়বে, আর তার প্রভাব গিয়ে পড়তে পারে টিকিটের দামে। এই অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে বিমান ভাড়া এমনিতেই বেশি।
টিবিএসের হাতে আসা চার্জ সংশোধনের প্রস্তাবিত নথিতে উড়োজাহাজ অবতরণ, যাত্রী ওঠানামার বোর্ডিং ব্রিজ, রুট নেভিগেশন এবং নির্ধারিত সময়ের বাইরে বিমানবন্দর পরিচালনার ফি বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের এমবার্কেশন ফি (যাত্রীপ্রতি বিমানবন্দর ব্যবহারের ফি) বাড়ানোরও প্রস্তাব আছে।
তবে এখনো আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব জমা পড়েনি। বেবিচকের সদস্য (অর্থ) ও যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ নাজমুল হক জানান, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পাঠানো হয়নি। তাঁর ভাষ্য, চার্জ সমন্বয়ের জন্য নিয়মিত প্রস্তুতি ও প্রাথমিক মূল্যায়ন চলতেই থাকে। প্রয়োজন হলে সংস্থাটি এ বিষয়ে উদ্যোগ নেবে।
অ্যারোনটিক্যাল চার্জ সর্বশেষ সংশোধন করা হয়েছিল ২০১৩ সালে। সাধারণত প্রতি সাত থেকে ১০ বছর অন্তর এই ফি পর্যালোচনা করা হয়। ২০২১ সালে বেবিচক চার্জ সংশোধনের প্রস্তাব দিলেও মন্ত্রণালয় তা বাস্তবায়ন করেনি।
প্রস্তাব অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ উভয় ফ্লাইটের ল্যান্ডিং চার্জ ২৫ শতাংশ করে বাড়বে। উড়োজাহাজের ওজনের ভিত্তিতে এই ফি নির্ধারিত হয়। আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে ১০ টন পর্যন্ত ওজনের উড়োজাহাজের ক্ষেত্রে প্রতি হাজার কেজিতে চার্জ ৫ দশমিক ২৫ ডলার থেকে বেড়ে হবে ৬ দশমিক ৫৬ ডলার। ১০০ টনের বেশি ও ৩০০ টন পর্যন্ত ওজনের উড়োজাহাজের ক্ষেত্রে তা ১২ ডলার থেকে বেড়ে ১৫ ডলার হবে। অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটে একই ওজনশ্রেণিতে প্রতি হাজার কেজিতে চার্জ ১৮৮ টাকা থেকে বেড়ে ২৩৫ টাকা হবে।
ঢাকা বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল ছাড়া অন্য সব ক্ষেত্রে প্যাসেঞ্জার বোর্ডিং ব্রিজ ব্যবহারের চার্জও ২৫ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। ১০০ টনের কম ওজনের উড়োজাহাজের ক্ষেত্রে প্রথম দুই ঘণ্টায় ঘণ্টাপ্রতি চার্জ ১০০ ডলার থেকে বেড়ে হবে ১২৫ ডলার। ৩০০ টন বা তার বেশি ওজনের উড়োজাহাজের ক্ষেত্রে তা ২৫০ ডলার থেকে বেড়ে হবে ৩১২ দশমিক ৫০ ডলার।
নির্ধারিত সময়ের বাইরে ফ্লাইট পরিচালনার চার্জেও বড় বাড়ার প্রস্তাব আছে। আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে বিমানবন্দরের সুবিধা ব্যবহারের ফি ঘণ্টায় ২২৫ ডলার থেকে ২৭ শতাংশ বেড়ে হবে ২৮৫ ডলার। অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটে তা ৩৩ শতাংশ বেড়ে ঘণ্টায় ৪ হাজার টাকা থেকে ৬ হাজার টাকা হবে। একই সময়ে এয়ার নেভিগেশন সুবিধা ব্যবহারের চার্জ ঘণ্টায় ৯০ ডলার থেকে বেড়ে ১১৫ ডলার হবে।
রুট নেভিগেশন চার্জ আলাদাভাবে ১০ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে বেবিচক। আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে ১০০ টনের বেশি ও ২০০ টন পর্যন্ত ওজনের উড়োজাহাজের জন্য এই ফি ৪২০ ডলার থেকে বেড়ে ৪৬২ ডলার হবে। ২০০ টনের বেশি ওজনের উড়োজাহাজের ক্ষেত্রে তা ৪৫০ ডলার থেকে বেড়ে হবে ৪৯৫ ডলার। এ ছাড়া ওভারফ্লাইট চার্জ, অর্থাৎ অবতরণ না করে আকাশসীমা ব্যবহার করে উড়ে যাওয়ার ফি, ঢাকা বিমানবন্দরের হিসাব থেকে সরিয়ে বেবিচকের সদর দপ্তরের হিসাবে স্থানান্তরের সুপারিশও করা হয়েছে।
সরাসরি চাপ পড়বে যাত্রীদের ওপর। টিকিটের দামের সঙ্গে বাড়তি এমবার্কেশন ফি যুক্ত হবে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল ছাড়া অন্য টার্মিনালে বিদেশগামী প্রতি যাত্রীর ফি বর্তমান ৫০০ টাকা (প্রায় ৪ ডলার) থেকে বেড়ে হবে ৬ ডলার। অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটে এই ফি ২৫ টাকা থেকে বেড়ে হবে ১০০ টাকা। তৃতীয় টার্মিনালের জন্য যাত্রীপ্রতি ১২ দশমিক ৫০ ডলার ফি প্রস্তাব করা হয়েছে। এসব চার্জ টিকিটের মূল দাম এবং অন্যান্য কর ও ফির সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় ভ্রমণের সামগ্রিক খরচ আরও বাড়বে।
হেলিকপ্টার পরিচালনাকারী সংস্থার ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। এখন ওজনের ভিত্তিতে হেলিকপ্টারের ল্যান্ডিং, নেভিগেশন ও নিরাপত্তা ফি মিলিয়ে ৪৫০ থেকে ৮০০ টাকা দিতে হয়। নতুন পরিকল্পনায় ওজন নির্বিশেষে একক হার প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে অভ্যন্তরীণ রুটে প্রতিবার ৩ হাজার টাকা এবং আন্তর্জাতিক পরিচালনায় ৫০ ডলার দিতে হবে।
চার্জ বাড়ানোর পক্ষে যুক্তি দিয়েছে বেবিচক। সংস্থাটির অভ্যন্তরীণ এক উপস্থাপনায় বলা হয়েছে, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে এর পরিচালন ব্যয় ছিল ১ হাজার ১৮৬ কোটি টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে হয়েছে ৩ হাজার ২৪২ কোটি টাকা। মোট আয়ের ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশই আসে অ্যারোনটিক্যাল চার্জ থেকে। বেবিচকের মতে, বর্তমান ফি কাঠামোয় আসন্ন উন্নয়ন ও পরিচালন ব্যয় মেটানো সম্ভব নয়। ঢাকা বিমানবন্দরের নতুন তৃতীয় টার্মিনালের ঋণ পরিশোধে বছরে প্রায় ১ হাজার ২৫০ কোটি টাকা লাগছে। এর বাইরে ট্যাক্সিওয়ে, অ্যাপ্রোন (উড়োজাহাজ রাখার স্থান), কার্গো সুবিধা ও আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার (আইসিএও) মান অনুযায়ী যোগাযোগব্যবস্থা উন্নয়নেও বড় বিনিয়োগ দরকার। আধুনিক নেভিগেশন ও নজরদারি ব্যবস্থা রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয়ও বাড়ছে।
অন্যদিকে খাতসংশ্লিষ্টরা সতর্ক করছেন, প্রস্তাব কার্যকর হলে ভাড়া প্রতিযোগিতামূলক রাখা এয়ারলাইনসগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে। ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের মুখপাত্র কামরুল ইসলাম বলেন, এভিয়েশন চার্জ বাড়লে যাত্রী বৃদ্ধির হার থেমে যেতে পারে। এতে এয়ারলাইনসগুলোর বহর ও নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও ব্যাহত হতে পারে। তাঁর ভাষ্য, সিঙ্গাপুর, কুয়ালালামপুর, ব্যাংকক ও গুয়াংজুর মতো প্রতিদ্বন্দ্বী বাজারের তুলনায় বাংলাদেশে পরিচালিত এয়ারলাইনসকে আগে থেকেই বেশি ল্যান্ডিং, পার্কিং, নিরাপত্তা ও এয়ার নেভিগেশন চার্জ দিতে হচ্ছে। তিনি বলেন, ভাড়া প্রতিযোগিতামূলক রাখতে হলে এভিয়েশন চার্জ ও জেট ফুয়েলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার সুযোগ থাকতে হবে। জেট ফুয়েলের অস্থির দামের সঙ্গে নতুন ফি যুক্ত হলে সাশ্রয়ী ভ্রমণ ধরে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়বে বলে তাঁর আশঙ্কা।
কোভিড-১৯ মহামারির পর দেশে বিমান ভাড়া দ্বিগুণ থেকে তিন গুণ পর্যন্ত বেড়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের নানা নীতিগত পদক্ষেপের পরও ভাড়া মহামারির আগের স্তরে ফেরার তেমন লক্ষণ দেখা যায়নি। এই দীর্ঘস্থায়ী চাপে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন প্রবাসী কর্মীরা।
ট্রাভেল এজেন্টদের অভিযোগ, টিকিট সিন্ডিকেট পরিস্থিতি আরও খারাপ করছে। মধ্যপ্রাচ্য ও মালয়েশিয়ার মতো শ্রমবাজারের প্রধান রুটে কৃত্রিমভাবে ভাড়া চড়া রাখা হচ্ছে। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে বেসামরিক বিমান পরিবহন মন্ত্রণালয় টিকিটের মূল্য নির্ধারণে স্বচ্ছতা আনা, গ্রুপ বুকিংয়ে যাত্রীর বিস্তারিত তথ্য বাধ্যতামূলক করা এবং টিকিটের দাম প্রকাশ্যে জানানোর নির্দেশনা দিয়েছিল। তবু বাজারে অস্থিরতা ও কারসাজি রয়ে গেছে।
ঢাকার ট্রাভেল এজেন্ট মাহমুদুল হক পিয়ারু জানান, বর্তমানে ইকোনমি ক্লাসে একমুখী যাত্রায় জেদ্দার ভাড়া ৬৫ থেকে ৭০ হাজার টাকা, দোহার ৪৫ থেকে ৫০ হাজার টাকা এবং মালয়েশিয়ার ২৫ থেকে ৩৫ হাজার টাকা। তাঁর মতে, জ্বালানি খরচের পাশাপাশি ল্যান্ডিং, পার্কিং ও পরিচালন চার্জই এয়ারলাইনসের ব্যয়ের মূল ভিত্তি। বিমান ভাড়া আগে থেকেই অনেক বেশি, তাই চার্জ সমন্বয়ের আগে সরকারকে এয়ারলাইনসের পরিচালন ব্যয় ও সাধারণ মানুষের সামর্থ্যের মধ্যে ভারসাম্য আনতে হবে।
সব মিলিয়ে বেবিচকের সামনে এখন দ্বিমুখী চাপ। একদিকে বাড়তে থাকা ব্যয় ও ঋণের বোঝা, অন্যদিকে চড়া ভাড়ায় ক্লান্ত যাত্রী ও চাপে থাকা এয়ারলাইনস। প্রস্তাবটি মন্ত্রণালয়ে গেলে শেষ পর্যন্ত কী সিদ্ধান্ত হয়, সেদিকেই এখন নজর খাতসংশ্লিষ্টদের।

