চাকরির প্রলোভনে কম্বোডিয়ায় গিয়ে অনলাইন প্রতারণার কেন্দ্রে বন্দী হয়েছিলেন বাংলাদেশি তরুণ তোফায়েল আহমেদ। প্রায় দুই মাস সেখানে আটকে থাকার পর এক রাতে হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার সুযোগে তিনি পালিয়ে আসেন। তাঁর এই অভিজ্ঞতা সামনে এনেছে একটি বড় সংকট। চাকরির নামে প্রতারণা ও মানব পাচারের ফাঁদে পড়ছেন বহু বাংলাদেশি।
কম্বোডিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের ১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশটি থেকে ৩ হাজার ৩৬৪ জন বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠানো হয়েছে। এঁদের মধ্যে ৮৫২ জনকে অনলাইন প্রতারণার সঙ্গে সম্পৃক্ত হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। তবে তাঁদের মধ্যে কতজন পাচারের শিকার হয়ে জোর করে অপরাধে যুক্ত হয়েছেন, তা মন্ত্রণালয় স্পষ্ট করেনি।
তোফায়েল চলতি বছরের ৩০ এপ্রিল কম্বোডিয়ায় যান। যাওয়ার আগে তিনি জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) স্মার্ট কার্ড সংগ্রহ করেছিলেন। তাঁকে ডেটা এন্ট্রির চাকরির কথা বলা হলেও নিয়োগের আমন্ত্রণপত্রে উল্লেখ ছিল নির্মাণকাজের কথা। এ কাজের জন্য দেশের রিক্রুটারদের তিনি ৭ লাখ ৭০ হাজার টাকা দিয়েছিলেন।
কম্বোডিয়ায় পৌঁছানোর পর রাতের বেলায় তাঁকে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার দূরের একটি কম্পাউন্ডে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে গিয়ে তিনি বুঝতে পারেন, এটি একটি অনলাইন প্রতারণার কেন্দ্র। তাঁর অভিযোগ, দেশের রিক্রুটাররা তাঁকে প্রায় দুই হাজার ডলারের বিনিময়ে ওই কম্পাউন্ডের কাছে বিক্রি করে দিয়েছেন।
তোফায়েল বলেন, তিনি প্রতারণার কেন্দ্রে কাজ করতে রাজি নন বলে জানালে তাঁকে বলা হয় যে তাঁর কোনো উপায় নেই, কাজ চালিয়ে যেতে হবে। তাঁর অভিযোগ, মুক্তির জন্য তাঁকে দুই হাজার ডলার দিতে বলা হয় এবং রাত ১০টা থেকে সকাল ১০টা পর্যন্ত কাজ করতে বাধ্য করা হয়। লক্ষ্য পূরণ করতে না পারলে বিদ্যুতের শক দেওয়া হতো এবং খাবার দেওয়া হতো না বলেও তিনি জানান। তাঁর ভাষ্য, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হতো সবার ওপরই।
এক মাস ২৭ দিন সেখানে আটকে থাকার পর মুক্তির পথ খুলে যায়। ব্যাংক হিসাব খোলার প্রয়োজন বলে তত্ত্বাবধায়ককে বুঝিয়ে তিনি নিজের পাসপোর্ট ফেরত নেন। এর কিছুক্ষণ পরই রাত আড়াইটার দিকে সামান্য সময়ের জন্য বিদ্যুৎ চলে যায়। সেই সুযোগে তিনি ১১ ফুট উঁচু দেয়াল টপকে পালান। দেয়াল ডিঙানোর সময় আহত হলেও খালি পায়ে প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার দৌড়ে একটি গাছের নিচে আশ্রয় নেন।
পরে পরিবারের কাছ থেকে ২০ ডলার জোগাড় করে তিনি অন্যত্র সরে যান। ধরা পড়লে প্রাণনাশের আশঙ্কা ছিল বলে জানান তিনি। রিক্রুটাররা তাঁকে এক বছরের ভিসা ও কাজের অনুমতি দেওয়ার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তা কখনো দেননি। ফলে তিনি কম্বোডিয়ায় বৈধ অভিবাসন মর্যাদাহীন অবস্থায় ছিলেন।
ফেসবুকে তিনি জানতে পারেন, থাইল্যান্ডে বাংলাদেশ দূতাবাস অতিরিক্ত অবস্থানের জরিমানা মওকুফের ব্যবস্থা করেছে। সেই সুবিধা নিয়ে তিনি ১৪ জুন দেশে ফেরেন। বর্তমানে ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচি তাঁকে সহায়তা করছে।
ব্র্যাকের উদ্ধৃত বিএমইটির তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ১ জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কম্বোডিয়ায় কাজের জন্য ১৫ হাজার ৯৬৩ জন বাংলাদেশি কর্মসংস্থান ছাড়পত্র পেয়েছেন। ব্র্যাক জানায়, কম্পিউটার অপারেটর, ডেটা এন্ট্রি ও গ্রাহকসেবার চাকরির কথা বলে দালালেরা বাংলাদেশিদের প্রলুব্ধ করছে। মাসে ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকার বেশি বেতনের প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হচ্ছে।
অনেকে এ জন্য ২ থেকে ৭ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ করেন। কিন্তু সেখানে গিয়ে তাঁদের পাহারাদার-ঘেরা কম্পাউন্ডে আটকে রাখা হয়, পাসপোর্ট ও মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হয় এবং অনলাইন প্রতারণায় বাধ্য করা হয়। ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচি ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরীফুল হাসান এই শোষণকে ‘সাইবার দাসত্ব’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
ব্র্যাকের তথ্য অনুযায়ী, জুন পর্যন্ত কম্বোডিয়া থেকে ৫৮৩ জন বাংলাদেশিকে দেশে ফেরানো হয়েছে। এঁদের মধ্যে ১০৯ জনকে প্রতারণা কেন্দ্র থেকে উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া থাইল্যান্ডে বাংলাদেশ দূতাবাসের কাছে দেশে ফেরার সহায়তা চেয়ে অনুরোধ করেছেন ১ হাজার ৭৯৬ জন। এঁদের মধ্যে আনুমানিক ৩০০ থেকে ৪০০ জন ফিরেছেন। ওই সময় প্রায় ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ জন ফেরার অপেক্ষায় ছিলেন।
গত ২০ অক্টোবর কম্বোডিয়া ছেড়ে আসার চেষ্টার সময় আটক হওয়া আরও ৩০ জন বাংলাদেশি দূতাবাসের হস্তক্ষেপে দেশে ফিরেছেন। তোফায়েল আহমেদ চান, সাংবাদিকেরা যেন বিষয়টি নিয়ে সোচ্চার হন। তাঁর ভাষ্য, গ্রামের মানুষ যেন এক কাজের কথা বলে অন্য কাজে বাধ্য করা দালালদের হাতে না পড়েন।

