সড়ক দুর্ঘটনায় একই পরিবারের একাধিক সদস্যের প্রাণহানির প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ছয় বছর ১০ মাসে দেশে প্রায় ৩০০ পরিবার দুর্ঘটনায় পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। মোটরবাইক, অটোরিকশা, প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস, অ্যাম্বুলেন্স ও বাসের দুর্ঘটনায় এমন ঘটনা ঘটছে। আজ রোববার প্রকাশিত প্রতিবেদনে সংস্থাটি এ তথ্য জানিয়েছে।
২০২০ সাল থেকে চলতি বছরের অক্টোবর পর্যন্ত সময়ের দুর্ঘটনার তথ্য পর্যবেক্ষণ করে এ চিত্র পাওয়া গেছে। এ ক্ষেত্রে গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের সঙ্গে ফাউন্ডেশনের নিজস্ব সংগৃহীত তথ্য মিলিয়ে দেখা হয়েছে।
মোটরবাইক দুর্ঘটনায় স্বামী-স্ত্রী একসঙ্গে নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে ১৯৩টি, যাতে প্রাণ হারিয়েছেন ৩৮৬ জন। পিতা ও সন্তান একসঙ্গে নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে ১৫৯টি। এসব দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ৩১৮ জন। অর্থাৎ দুই চাকার এই যানটি অনেক পরিবারের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র অটোরিকশার ক্ষেত্রে। এ ধরনের যানের দুর্ঘটনায় একই পরিবারের দুই সদস্য নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে ২১১টি। তিন সদস্য নিহত হয়েছেন ১১৮টি ঘটনায়, চার সদস্য ৯২টিতে, পাঁচ সদস্য ৫৩টিতে, ছয় সদস্য ৩৮টিতে এবং সাত সদস্য নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে ১৩টি। সব মিলিয়ে ৫২৫টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১ হাজার ৭২৮ জন।
মাইক্রোবাসের দুর্ঘটনাতেও একই পরিবারের একাধিক সদস্য প্রাণ হারানোর ঘটনা কম নয়। দুই সদস্য নিহত হয়েছেন ৪৮টি ঘটনায়, তিন সদস্য ৪৬টিতে, চার সদস্য ৩৯টিতে, পাঁচ সদস্য ২৮টিতে এবং ছয় সদস্য ২০টিতে। এ ছাড়া ১১ সদস্য নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে চারটি এবং ১৪ সদস্য নিহত হওয়ার ঘটনা একটি। মোট ১৮৬টি দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ৭০৮ জন।
প্রাইভেটকার দুর্ঘটনায় একই পরিবারের দুই সদস্য নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে ৩৪টি। তিন সদস্য নিহত হয়েছেন ৩১টি ঘটনায়, চার সদস্য ২৪টিতে এবং পাঁচ সদস্য ১৯টিতে। মোট ১০৮টি দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে ৩৫২ জনের।
অ্যাম্বুলেন্স দুর্ঘটনায় একই পরিবারের দুই সদস্য মারা গেছেন ১১টি ঘটনায়, তিন সদস্য ১৫টিতে, চার সদস্য নয়টিতে, পাঁচ সদস্য সাতটিতে এবং আট সদস্য তিনটিতে। মোট ৪৫টি দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৬২ জন। অসুস্থ স্বজনকে নিয়ে হাসপাতালে ছুটতে গিয়ে পরিবারের একাধিক সদস্যের এভাবে প্রাণ হারানোর ঘটনা বিশেষভাবে বেদনাদায়ক।
বাস দুর্ঘটনায় একই পরিবারের দুই সদস্য নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে ১৭টি, তিন সদস্য নয়টি এবং চার সদস্য ছয়টি। মোট ৩২টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৮৫ জন। এ ছাড়া একটি পিকআপ ভ্যান নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে গিয়ে একই পরিবারের চার সদস্যের মৃত্যুর ঘটনাও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশন এ ধরনের প্রাণহানির পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে রয়েছে পরিবারের সবাই একসঙ্গে কাজে বা বেড়াতে যাওয়ার প্রবণতা বেড়ে যাওয়া, মহাসড়কে অটোরিকশা চলাচল এবং অধিকাংশ মাইক্রোবাস ও অ্যাম্বুলেন্সের ফিটনেস না থাকা। পাশাপাশি এসব যানের চালকদের অদক্ষতা এবং বিশ্রাম ছাড়া একটানা গাড়ি চালানোকেও দায়ী করা হয়েছে। মানসম্মত হেলমেট ব্যবহার না করা, বেপরোয়া মোটরবাইক চালানো এবং ট্রাফিক আইন না মানার প্রবণতাও দুর্ঘটনার বড় কারণ বলে উল্লেখ করেছে সংস্থাটি।
দুর্ঘটনা কমাতে মোটরবাইক আরোহীদের ভালো মানের হেলমেট ব্যবহার এবং ট্রাফিক আইন মেনে যান চালানোর সুপারিশ করা হয়েছে। সব মহাসড়কে সড়ক বিভাজক ও সার্ভিস রোড নির্মাণের কথাও বলেছে ফাউন্ডেশন। গ্রামীণ সড়ক থেকে সরাসরি মহাসড়কে ওঠার সুযোগ না রেখে নিরাপদ সড়ক নকশা তৈরির পরামর্শও দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া সড়ক-মহাসড়কে যানবাহন চলাচলের নজরদারি বাড়ানো, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং সড়ক ব্যবহারকারীদের সক্ষমতা বাড়াতে শিক্ষা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানোর সুপারিশ রয়েছে।
প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, সড়কের এই সংকট এখন আর শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতির বিষয় নয়, এটি সামাজিক বিপর্যয়েও রূপ নিচ্ছে। একটি পরিবারের একসঙ্গে সবাই হারিয়ে যাওয়া মানে শুধু কয়েকজনের মৃত্যু নয়, বরং পুরো একটি পরিবারের স্বপ্ন, আয় ও ভবিষ্যৎ নিঃশেষ হয়ে যাওয়া। ফিটনেসবিহীন যান, অদক্ষ চালক ও মহাসড়কের অনিরাপদ নকশা এখনো যেভাবে চলছে, তাতে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এ ধরনের মর্মান্তিক ঘটনা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।

