ভোর ছয়টা। বসুন্ধরার একটি বাড়ির সামনে ব্যস্ততা। কেউ হাসপাতালে যাচ্ছে, কেউ ফিরে গোসল সেরে খেতে বসেছে। এখানে কেউ কারও আত্মীয় নয়, তবু সবাই এক পরিবার। কারণ সবার একটাই পরিচয়, তারা ক্যান্সারের সঙ্গে লড়ছে। এই বাড়ির নাম মোসাব্বির আলোক নিবাস।
গোপালগঞ্জের মোমেনা বেগমের ছেলে ইয়ামিনের বয়স তখন এগারো। রক্তের ক্যান্সার ধরা পড়ল। ঢাকায় থাকার জায়গা নেই। স্বামী নেই। দক্ষিণখানের বস্তিতে শুরু হলো লড়াই। ভাড়া, খাবার, যাতায়াত, রোগের চেয়ে এই হিসাবই ভারী হয়ে উঠছিল। পরে হাসপাতালের এক রোগীর মুখে শুনলেন আলোক নিবাসের কথা। এখন তিনি বলেন, আত্মীয়ের বাড়িতে একদিন গেলেও মুখ ভার দেখতে হয়, কিন্তু এখানে নিজেকে মুক্ত মনে হয়।
এই ঘরের পেছনে আছেন নাজমুস আহমেদ আলবাব। একসময় সফল গার্মেন্টস ব্যবসায়ী। ২০১১ সালে জ্বর ভেবে হাসপাতালে গিয়ে ধরা পড়ল অ্যাকিউট মায়েলয়েড লিউকেমিয়া, এক ধরনের ব্লাড ক্যান্সার। সিঙ্গাপুরে চিকিৎসা, কেমোথেরাপি, ভেঙে পড়া শরীর আর মন। পাশে ছিলেন মা, বাবা, ছেলে। সুস্থ হয়ে ফিরে তিনি আর পুরোনো জীবনে ফিরতে পারলেন না।
২০১৩ সালে ব্যবসা ছেড়ে দিলেন। ২০১৫ সালে গড়লেন বাংলাদেশ ক্যানসার এইড ফাউন্ডেশন। ২০১৯ সালে সেটি হলো বাংলাদেশ ক্যানসার এইড ট্রাস্ট, ব্যানক্যাট। তাঁর বিশ্বাস, চিকিৎসার ৩০ ভাগ ওষুধ, বাকি ৭০ ভাগ যত্ন। টাকা দিয়ে সাহায্য করতে করতে বুঝলেন, শুধু টাকায় হবে না। রোগীরা হাসপাতালের বারান্দায়, মেঝেতে থাকেন। তাই ২০১৯ সালে বসুন্ধরায় একতলা ভাড়া বাড়িতে শুরু হলো আলোক নিবাস। ২০২১ সালে আনুষ্ঠানিক সেবা শুরু। এখন দুটি ভবনে রোগীদের জন্য ৮৫টি শয্যা, সঙ্গে সমসংখ্যক স্বজনের থাকার ব্যবস্থা। মোট ক্ষমতা প্রায় ১৭০ জন। থাকা ও খাবার রোগীর জন্য বিনামূল্যে। প্রতিদিন প্রায় ৬০০ বেলা খাবার রান্না হয়, পুষ্টিবিদের ডায়েট চার্ট অনুযায়ী।
নামের পেছনে আছে আরেক বাবার গল্প। বীর প্রতীক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোদাচ্ছির হোসেন খানের ছেলে মোসাব্বির মাত্র ১৪ বছর বয়সে ক্যান্সারে চলে যায়। ২০০৪ সালে ছেলের স্মৃতিতে তিনি গড়েছিলেন ক্যানসার কেয়ার সেন্টার। পরে নিজের প্রতিষ্ঠান আর সঞ্চয় তুলে দিলেন আলবাবের হাতে। ছেলের নামেই হলো মোসাব্বির আলোক নিবাস। এখানে আছে আলোক কাঁথা। ফেলে দেওয়া শাড়ি দিয়ে রোগী ও স্বজনেরা কাঁথা সেলাই করেন। সেলাইয়ে মন হালকা হয়, বিক্রির টাকা যায় রোগীদের কাজে। আছে আলোকন, মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা।
এবার স্বপ্ন আরও বড়। মানিকগঞ্জের সিংগাইরে, জয়মন্টপে তৈরি হচ্ছে আলোক বসতি, দেশের প্রথম ক্যান্সার কেয়ার ভিলেজ। ৫ বিঘা জমিতে ২৫০ শয্যার পরিকল্পনা। থাকবে হসপিস, প্যালিয়েটিভ কেয়ার, আবাসন, স্ক্রিনিং, কাউন্সেলিং, কেয়ারগিভার প্রশিক্ষণ। লক্ষ্য বছরে ৫ হাজারের বেশি রোগীকে সেবা। প্রকল্পটি এখন নির্মাণাধীন।
ক্যান্সার অনেক কিছু কেড়ে নেয়। টাকা, শক্তি, কখনো প্রিয়জন। কিন্তু আলোক নিবাস প্রমাণ করছে, একটা জিনিস কেড়ে নিতে পারে না, আরেকজন মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ইচ্ছা।
এই ফিচারটি প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদনের ভিত্তিতে লেখা। অনুদান দেওয়ার জন্য তাদের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট ও অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ ভিজিট করুন।
*নাজমুস আহমেদ আলবাব- প্রতিষ্ঠাতা বাংলাদেশ ক্যানসার এইড ট্রাস্ট, ব্যানক্যাট- এর ফেসবুক পোস্ট থেকে সংগৃহীত।

