বাংলাদেশে শিক্ষিত বেকারত্বের চিত্র দিন দিন আরও জটিল হয়ে উঠছে। ২০২৩ সালে উচ্চতর ডিগ্রিধারী এক লাখেরও বেশি ব্যক্তি চাকরির সন্ধানে বের হন, যা দেশের বেকারের সংখ্যা আরও বাড়িয়ে তোলে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শুধু উচ্চ ডিগ্রিধারীদের সংখ্যা বৃদ্ধির প্রতিফলন নয় বরং দক্ষতার অভাবের ইঙ্গিতও দেয়।
শিক্ষিত বেকারত্বের বর্তমান অবস্থা-
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৩ অনুযায়ী- দেশে ২০২৩ সালে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী বেকারের সংখ্যা ছিল ৯ লাখ ৬ হাজার। যা ২০২২ সালের তুলনায় প্রায় ১৩.৪ শতাংশ বেশি। শিক্ষিত বেকারত্বের হার ২০২২ সালের ১২ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৩ সালে ১৩.১১ শতাংশে পৌঁছেছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শিক্ষাব্যবস্থায় ত্রুটি ও কর্মসংস্থানের সুযোগের অভাব একসঙ্গে কাজ করছে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) গবেষণা পরিচালক উল্লেখ করেছেন, স্নাতকধারীরা চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছেন না। এর প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে শিক্ষার মান ও দক্ষতার ঘাটতি।
কোটা সংস্কার আন্দোলন ও শিক্ষিত বেকারত্ব-
উচ্চতর ডিগ্রিধারী তরুণদের বেকারত্বের সমস্যার বিরুদ্ধে হতাশা প্রকাশ পায় ২০২৩ সালের জুলাই মাসে দেশব্যাপী কোটা সংস্কার আন্দোলনে। সরকারি চাকরির কোটা ব্যবস্থার পরিবর্তন এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধির দাবিতে তরুণরা পথে নামেন। পরবর্তীতে এই আন্দোলন রাজনৈতিক অস্থিরতার দিকে মোড় নেয়।
শ্বেতপত্রের হুঁশিয়ারি: ‘টিকিং টাইম বোমা’-
সম্প্রতি দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা নিয়ে প্রকাশিত একটি ৩৯৭ পৃষ্ঠার শ্বেতপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, বেকারত্ব বাংলাদেশে একটি ‘টিকিং টাইম বোমা’-তে পরিণত হয়েছে। এতে বলা হয়, দেশে স্নাতকধারীর সংখ্যা বাড়লেও চাকরির জন্য তাদের প্রস্তুতি অপ্রতুল। অনেক ক্ষেত্রে তাদের দক্ষতা এবং শ্রমবাজারের চাহিদার মধ্যে অসামঞ্জস্য স্পষ্ট।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী- পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রায় ৬০ শতাংশ কলা ও সামাজিক বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করছেন। যেখানে মাত্র ১২ শতাংশ বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত (এসটিইএম) বিষয়ে পড়ছেন। অপরদিকে, স্নাতক কলেজগুলোয় বিজ্ঞান বিষয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা আরও কম।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান: একটি অসম সম্পর্ক-
দেশের শিল্প ও সেবা খাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত। লেবার ফোর্স সার্ভে ২০২২ অনুযায়ী- শিল্পে কর্মসংস্থানের মাত্র ৯ শতাংশ এবং সেবা খাতে ২৩ শতাংশ সম্মানজনক কাজের সুযোগ আছে। ফলে বিপুল সংখ্যক স্নাতক চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতায় হেরে যাচ্ছেন।
জেনেভায় আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) সাবেক বিশেষ উপদেষ্টার মতে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি স্নাতকদের জন্য পর্যাপ্ত কাজের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারছে না। শ্রমবাজারের চাহিদা ও শিক্ষার্থীদের দক্ষতার মধ্যে যে ব্যবধান রয়েছে, তা দেশের মূল্যবান জনসম্পদের অপচয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন- দেশের উচ্চশিক্ষার কৌশল পুনর্বিবেচনা করা জরুরি। অপরিকল্পিতভাবে কলেজ প্রতিষ্ঠার বদলে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণের দিকে মনোযোগ দিতে হবে। এটি শুধু বেকারত্ব কমাবে না, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকেও ত্বরান্বিত করবে।
বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে পারে। শিক্ষিত বেকারত্বের সমস্যা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও কার্যকর নীতিমালা ছাড়া সমাধান সম্ভব নয়। গবেষণা ও তথ্য বলছে, কর্মজীবনের শুরুতে বেকারত্ব তরুণদের ভবিষ্যৎ পেশাগত উন্নয়নে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
বাংলাদেশের বেকারত্ব সমস্যা একটি জটিল সামাজিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ। দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা এবং পরিকল্পিত কর্মসংস্থান নীতি গ্রহণের মাধ্যমে এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ বের করা সম্ভব। শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে শিক্ষার্থীদের দক্ষতার সমন্বয় ঘটানো এখন সময়ের দাবি।

