দেশের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি জোরদার করেছে নির্বাচন কমিশন। প্রয়োজনীয় আইন ও বিধিমালা সংশোধনের কাজ শেষ করে আগামী আগস্টে নির্বাচনের তপশিল ঘোষণার পরিকল্পনা রয়েছে সংস্থাটির। সবকিছু ঠিক থাকলে সেপ্টেম্বরের শেষভাগ বা অক্টোবরের শুরু থেকেই ভোটগ্রহণ কার্যক্রম শুরু হতে পারে।
নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচন পরিচালনা বিধিমালা, আচরণবিধি এবং সংশ্লিষ্ট আইনের বিভিন্ন ধারা পর্যালোচনা করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক আইন সংশোধনের ফলে স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকের পরিবর্তে নির্দলীয়ভাবে অনুষ্ঠিত হওয়ার বিধান কার্যকর হওয়ায় বিদ্যমান বেশ কিছু নিয়ম নতুন বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হচ্ছে।
এ লক্ষ্যে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ এবং জেলা পরিষদের জন্য পৃথক আইন ও বিধিমালা হালনাগাদের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। সংশোধিত খসড়াগুলো চলতি মাসের মধ্যেই নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে। নাগরিক ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের মতামত গ্রহণের জন্য নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত তা উন্মুক্ত রাখা হবে।
নির্বাচন কমিশনের পরিকল্পনা অনুযায়ী, জনমত সংগ্রহ ও কমিশনের অনুমোদনের পর খসড়াগুলো আইন মন্ত্রণালয়ের যাচাইয়ের জন্য পাঠানো হবে। সরকারের চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়া গেলে জুলাইয়ের মধ্যেই পুরো সংস্কার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
আইনগত প্রস্তুতি শেষ হওয়ার পর ব্যালট পেপার, নির্বাচনি সামগ্রী, লজিস্টিকস ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা সম্পন্ন করে আগস্টে অন্তত একটি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচনের তপশিল ঘোষণা করা হতে পারে। তবে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ কিংবা সিটি করপোরেশন—কোন নির্বাচন দিয়ে ভোটযাত্রা শুরু হবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, এ বিষয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনা করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ও নির্বাচনের সময়সূচি নির্ধারণে কমিশনের সঙ্গে সমন্বয়ের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
বর্তমানে দেশের ৪ হাজার ৫৮১টি ইউনিয়ন পরিষদ, ৪৯৫টি উপজেলা পরিষদ, ৩৩০টি পৌরসভা, ৬১টি জেলা পরিষদ এবং ১৩টি সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন পদ নির্বাচনযোগ্য অবস্থায় রয়েছে। ফলে আগামী কয়েক মাসে দেশের বৃহত্তম স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশন।
এদিকে নির্বাচন আয়োজনের জন্য নতুন অর্থবছরে প্রায় ২ হাজার ৯০০ কোটি টাকা বরাদ্দ চেয়েছে কমিশন। প্রস্তাবিত এ অর্থ মূলত স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রাথমিক ধাপ বাস্তবায়নে ব্যয় করা হবে। তবে সব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন সম্পন্ন করতে কমিশনের মোট প্রয়োজন প্রায় ৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
নির্বাচন কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, শুধু ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আয়োজনেই প্রয়োজন হবে প্রায় ২ হাজার ৯০০ কোটি টাকা। উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের জন্য প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা, সিটি করপোরেশন নির্বাচনের জন্য ৩৩০ কোটি টাকা এবং পৌরসভা নির্বাচনের জন্য প্রায় ৩০০ কোটি টাকার চাহিদা রয়েছে।
তবে ব্যয়ের ক্ষেত্রে আগের মতো কৃচ্ছ্রসাধনের নীতি অনুসরণ করতে চায় কমিশন। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরাদ্দ পাওয়া অর্থের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ সাশ্রয় করতে সক্ষম হয়েছিল সংস্থাটি। একইভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও অপ্রয়োজনীয় খরচ কমিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, ভোটগ্রহণের সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী নির্বাচনের এক থেকে দেড় মাস আগে তপশিল ঘোষণা করা হয়। সেই হিসাবে আগস্টে তপশিল ঘোষণা হলে ভোটগ্রহণ সেপ্টেম্বরের শেষভাগ থেকে অক্টোবরের মধ্যে অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
তবে চূড়ান্ত সময়সূচি নির্ধারণে আবহাওয়া, বর্ষা মৌসুম, প্রশাসনিক প্রস্তুতি এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বার্ষিক পরীক্ষার বিষয়গুলোও বিবেচনায় রাখা হবে। নির্বাচন কমিশনের মতে, অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত সময়কে ভোট আয়োজনের জন্য সবচেয়ে উপযোগী ধরা হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, জাতীয় নির্বাচনের পর স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজন দেশের গণতান্ত্রিক ও প্রশাসনিক কাঠামোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে অনেক স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির মেয়াদ শেষ হওয়ায় নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রয়োজনীয়তা বেড়েছে। ফলে আইনগত প্রস্তুতি, পর্যাপ্ত অর্থায়ন এবং সময়মতো তপশিল ঘোষণার মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে পুনরায় কার্যকর ও শক্তিশালী করার সুযোগ পাচ্ছে।
এখন সরকারের সঙ্গে আলোচনার পর কোন স্তরের স্থানীয় সরকার নির্বাচন আগে অনুষ্ঠিত হবে এবং তপশিল ঘোষণার চূড়ান্ত তারিখ কী নির্ধারিত হয়, সেদিকেই নজর রাজনৈতিক মহল ও ভোটারদের।

