দেশের খাদ্যনিরাপত্তা, গ্রামীণ কর্মসংস্থান এবং অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি কৃষি খাত। কিন্তু উৎপাদন ব্যয়, জলবায়ু ঝুঁকি এবং খাদ্য মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়তে থাকলেও জাতীয় বাজেটে কৃষির গুরুত্ব ক্রমেই কমছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও কৃষি বিশেষজ্ঞরা। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটেও সেই প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে।
সরকার আগামী অর্থবছরের জন্য প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট প্রণয়নের প্রস্তুতি নিয়েছে। এর মধ্যে কৃষি মন্ত্রণালয়ের জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে ২৮ হাজার ৭৭৬ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের তুলনায় এ বরাদ্দ কিছুটা বেশি হলেও সামগ্রিক বাজেটের অনুপাতে কৃষি খাতের অংশ কমে যাচ্ছে।
হিসাব অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে জাতীয় বাজেটের ৩ দশমিক ৪৫ শতাংশ কৃষি মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ ছিল। নতুন অর্থবছরে তা কমে প্রায় ৩ দশমিক ০৭ শতাংশে নেমে আসতে পারে। অর্থাৎ টাকার অঙ্কে বরাদ্দ বাড়লেও জাতীয় বাজেটের তুলনায় কৃষির অংশীদারিত্ব কমছে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, দুই বছর আগের তুলনায় কৃষি মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে কৃষি মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ ছিল ৩৩ হাজার ২৭৫ কোটি টাকা। সেই তুলনায় নতুন প্রস্তাবিত বরাদ্দ প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা কম।
গত কয়েক বছরের তথ্য বিশ্লেষণেও একই চিত্র পাওয়া যায়। কৃষি খাতে একসময় জাতীয় বাজেটের ১০ শতাংশের বেশি বরাদ্দ দেওয়া হলেও বর্তমানে তা ৬ শতাংশেরও নিচে নেমে এসেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, খাদ্যনিরাপত্তার মতো কৌশলগত খাতের জন্য এটি উদ্বেগজনক সংকেত।
অন্যদিকে কৃষকদের জন্য ভর্তুকি ও প্রণোদনার পরিমাণও কাঙ্ক্ষিত হারে বাড়ছে না। কয়েক বছর ধরে কৃষি ভর্তুকি ধারাবাহিকভাবে কমেছে। চলতি অর্থবছরের মতো আগামী অর্থবছরেও কৃষি প্রণোদনা প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকায় স্থির রাখা হতে পারে বলে জানা গেছে।
কৃষক সংগঠন ও বিশেষজ্ঞদের দাবি, সার, বীজ, সেচ, কৃষিযন্ত্র এবং কৃষিঋণের বাড়তি ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে ভর্তুকির পরিমাণ কমপক্ষে ৩৫ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করা প্রয়োজন। তাদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে স্থির ভর্তুকি বাস্তবে সহায়তা কমে যাওয়ার শামিল।
কৃষি অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বরাদ্দ বৃদ্ধির যে চিত্র দেখা যাচ্ছে, মূল্যস্ফীতির কারণে তার প্রকৃত মূল্য অনেকটাই কমে যাচ্ছে। বর্তমানে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে কৃষি খাতে সরকারি ব্যয়ের কার্যকারিতা আগের তুলনায় হ্রাস পাচ্ছে। ফলে কাগজে-কলমে বরাদ্দ বাড়লেও বাস্তব ক্ষেত্রে কৃষকরা তেমন সুবিধা পাচ্ছেন না।
এদিকে কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধিও উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক অর্থবছরে কৃষি প্রবৃদ্ধি ৩ শতাংশেরও নিচে নেমে এসেছে। উৎপাদন বাড়ার গতি কমে গেলে খাদ্য আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়তে পারে, যা বৈদেশিক মুদ্রার ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করবে।
বর্তমানে কৃষি খাত একাধিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। আকস্মিক বন্যা, দীর্ঘ খরা, লবণাক্ততার বিস্তার, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। একই সঙ্গে সেচ, জ্বালানি, সার, বীজ ও শ্রমিকের খরচও দ্রুত বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কৃষক এখন দ্বিমুখী চাপে রয়েছেন। একদিকে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে অনেক ক্ষেত্রেই উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। ফলে কৃষকের লাভ কমে যাচ্ছে এবং অনেকেই কৃষিকাজে আগ্রহ হারাচ্ছেন।
কৃষি গবেষক ও অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু বরাদ্দ বাড়ানোই যথেষ্ট নয়। কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, বাজার ব্যবস্থাপনা উন্নত করা, সংরক্ষণ সুবিধা বাড়ানো এবং কৃষি প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়ানোও জরুরি।
বিশেষ করে কৃষি যান্ত্রিকীকরণে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতির ওপর কর ও শুল্ক কমানোর দাবি উঠেছে। পাশাপাশি দেশীয়ভাবে কৃষিযন্ত্র উৎপাদনকারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা এবং গবেষণা সহায়তার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরছেন তারা।
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় স্মার্ট কৃষি প্রযুক্তি, সৌরশক্তিনির্ভর সেচ ব্যবস্থা এবং জলবায়ু সহনশীল ফসলের গবেষণায় আলাদা তহবিল গঠনের প্রস্তাবও এসেছে বিভিন্ন মহল থেকে।
বিশ্লেষকদের মতে, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষিকে ব্যয় নয়, বিনিয়োগ হিসেবে দেখতে হবে। দেশের প্রায় অর্ধেক মানুষের জীবিকা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির সঙ্গে যুক্ত। ফলে এ খাত দুর্বল হলে তার প্রভাব পড়বে কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতি, দারিদ্র্য এবং সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর।
সরকারের পক্ষ থেকে কৃষি খাতে ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা, কৃষক কার্ড, গবেষণা সম্প্রসারণ এবং উৎপাদন পরিকল্পনা উন্নয়নের কথা বলা হলেও বাস্তব চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিতে বিনিয়োগ, ভর্তুকি, গবেষণা এবং বাজার সংস্কার একসঙ্গে না হলে খাদ্যনিরাপত্তা রক্ষা কঠিন হয়ে পড়বে।
তাদের ভাষ্য, দেশের অর্থনীতি এক ট্রিলিয়ন ডলারের লক্ষ্যে এগোলেও কৃষি খাতকে যথাযথ গুরুত্ব না দিলে সেই লক্ষ্য অর্জনের পথ আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। কারণ শিল্প ও সেবাখাতের ভিত্তিও শেষ পর্যন্ত নির্ভর করে একটি শক্তিশালী ও টেকসই কৃষি ব্যবস্থার ওপর।

