বাংলাদেশে মানব পাচার এখন সবচেয়ে বড় আন্তঃসীমান্ত অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। গ্লোবাল অর্গানাইজড ক্রাইম ইনডেক্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, মানব পাচারের সূচক ১০-এর মধ্যে ৮ পয়েন্টে পৌঁছেছে, যা দেশের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বিশেষ করে রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকট এই পাচারের অন্যতম অনুঘটক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
রোহিঙ্গা শরণার্থীদের টার্গেট করে পাচার-
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা কক্সবাজারের বিভিন্ন শিবিরে আশ্রয় নিলেও, তারা পাচারকারীদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছে। দালাল চক্রের প্রলোভনে পড়ে অনেকেই উন্নত জীবনের আশায় বিদেশ যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
এর মধ্যে রয়েছেন আয়েশা আক্তার (ছদ্মনাম), যাকে মাত্র ২৫ হাজার টাকার বিনিময়ে মালয়েশিয়া পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছানোর পর তিনি বুঝতে পারেন, তাকে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশী নারীরাও পাচারের শিকার-
শুধু রোহিঙ্গারাই নয়, বাংলাদেশের অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল নারীরাও পাচার চক্রের শিকার হচ্ছেন। নাসিমা (ছদ্মনাম), যিনি ঢাকার একটি তৈরি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন, চাকরি হারানোর পর দালালদের প্রলোভনে পড়েন। তাকে সৌদি আরবে চাকরির আশ্বাস দিয়ে যশোর সীমান্ত দিয়ে ভারতে পাচার করা হয় এবং কলকাতার একটি যৌনপল্লীতে বিক্রি করে দেওয়া হয়। পরে একটি এনজিওর সহায়তায় তিনি দেশে ফিরে আসেন।
কক্সবাজার নৌপথ: পাচারের প্রধান রুট-
কক্সবাজার উপকূল হয়ে মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও ইন্দোনেশিয়ার দিকে মানব পাচারের প্রবণতা ব্যাপকহারে বেড়েছে। বিশেষ করে টেকনাফ, ইনানী, মহেশখালীসহ বেশ কয়েকটি উপকূলীয় অঞ্চল এখন পাচারকারীদের জন্য নিরাপদ রুটে পরিণত হয়েছে।
স্থানীয় দালালরা জনপ্রতি ২০-২৫ হাজার টাকা নিয়ে পাচারের জন্য লোক সংগ্রহ করে, পরে তাদের মালয়েশিয়ায় বিক্রি করা হয় চার থেকে পাঁচ লাখ টাকায়।
ভারত ও ইউরোপে পাচারের নতুন রুট-
বাংলাদেশ থেকে ভারতে নারী ও শিশু পাচারের অন্যতম রুট যশোরের শার্শা উপজেলা। এছাড়া ময়মনসিংহের সোমেশ্বরী নদী পেরিয়ে মেঘালয়ে পাচারের ঘটনাও বাড়ছে।
একইভাবে ইউরোপে মানব পাচারের প্রধানতম রুট এখন লিবিয়া। মধ্যপ্রাচ্য হয়ে সেখানে নেওয়ার পর অনেককে নৌকায় উঠিয়ে উত্তাল ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে বাধ্য করা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে লিবিয়া উপকূলে ভেসে আসা ২৩টি মরদেহের মধ্যে ১১ জন ছিলেন বাংলাদেশের মাদারীপুর জেলার বাসিন্দা।
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অবস্থান-
পুলিশ, বিজিবি ও কোস্টগার্ড পাচার প্রতিরোধে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি টেকনাফের বাহারছড়া থেকে ৬৬ জন পাচার হওয়ার অপেক্ষায় থাকা নারী, শিশু ও পুরুষকে উদ্ধার করা হয়েছে। গ্রেফতার করা হয়েছে পাচারকারী চক্রের পাঁচ সদস্যকে।
টেকনাফ মডেল থানার ওসি মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন জানান, কক্সবাজারকে ঘিরে গড়ে ওঠা পাচার সিন্ডিকেট ভাঙতে নিয়মিত নজরদারি ও অভিযান চালানো হচ্ছে।
মানবাধিকার সংস্থার উদ্বেগ-
মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন বলেন, পাচার চক্র ভাঙতে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কঠোর আইন প্রয়োগ জরুরি। অনেক ক্ষেত্রেই পাচার চক্রের সঙ্গে স্থানীয় প্রভাবশালীরা যুক্ত থাকায় এই অপরাধ প্রতিরোধ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিরাপদ অভিবাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, দালালদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর মাধ্যমে মানব পাচার প্রতিরোধ করা সম্ভব।

