মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) বড় ধরনের আর্থিক চাপের মুখে পড়েছে। গত মার্চ থেকে ১১ জুন পর্যন্ত মাত্র সাড়ে তিন মাসে সংস্থাটির লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৭ হাজার ৪০ কোটি টাকা। তবে জনস্বার্থে আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় কম দামে জ্বালানি বিক্রি অব্যাহত রাখায় এই ক্ষতি মেনে নিচ্ছে সরকার।
সোমবার জাতীয় সংসদে এক প্রশ্নের লিখিত জবাবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যায়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয়ের ওপর।
মন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মার্চ থেকে ১১ জুন পর্যন্ত বিপিসির মোট লোকসান হয়েছে ১৭ হাজার ৩৯ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে মার্চে লোকসান ২ হাজার ২৪৮ কোটি টাকা, এপ্রিলে ৭ হাজার ৮৬৬ কোটি টাকা, মে মাসে ২ হাজার ৬২৩ কোটি টাকা এবং জুনের প্রথম ১১ দিনেই ৪ হাজার ৩০১ কোটি টাকার বেশি ক্ষতি হয়েছে।
তিনি জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি সত্ত্বেও সরকার দেশে জ্বালানি তেলের দাম একই হারে বাড়ায়নি। ফলে ডিজেল, অকটেন ও পেট্রোল বিক্রিতে বিপিসিকে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৭৮ কোটি টাকা লোকসান বহন করতে হচ্ছে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এপ্রিল মাসে প্রতি লিটার ডিজেলের প্রকৃত ব্যয় ছিল ১৫৫ টাকা ৪৬ পয়সা এবং অকটেনের ১৪৮ টাকা ৯৩ পয়সা। কিন্তু সরকার ডিজেলের মূল্য নির্ধারণ করে ১১৫ টাকা এবং অকটেন ১৪০ টাকা। একইভাবে মে মাসে ডিজেলের প্রকৃত ব্যয় ২৩৪ টাকার বেশি হলেও দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়।
জুন মাসেও ডিজেলের প্রকৃত ব্যয় ছিল প্রতি লিটারে ১৭৫ টাকার বেশি। তবুও সরকার ডিজেলের মূল্য না বাড়িয়ে আগের হার বহাল রাখে। শুধু অকটেন, পেট্রোল ও কেরোসিনের দাম লিটারপ্রতি ৫ টাকা সমন্বয় করা হয়।
জ্বালানিমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেলের দাম ১৫২ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেলেও দেশে এর মূল্য বাড়ানো হয়েছে মাত্র ১৫ শতাংশ। একইভাবে অকটেনের আন্তর্জাতিক মূল্য ৮২ শতাংশ বাড়লেও দেশীয় বাজারে বৃদ্ধি করা হয়েছে মাত্র ২১ শতাংশ। ফলে জনগণকে মূল্যস্ফীতির অতিরিক্ত চাপ থেকে সুরক্ষা দিতে গিয়ে বিপিসিকে বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতি বহন করতে হচ্ছে।
সংসদে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ জুন পর্যন্ত দেশে মোট ৫ লাখ ২৯ হাজার ৫৬ মেট্রিক টন জ্বালানি তেল মজুত ছিল। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রয়েছে ডিজেল, যার পরিমাণ ৩ লাখ ৯৭ হাজার ১৯৯ মেট্রিক টন। এছাড়া ফার্নেস অয়েল ৭৬ হাজার ৭১২ টন, অকটেন ৪৪ হাজার ৮৩ টন, জেট ফুয়েল ৪১ হাজার ৩২৯ টন, পেট্রোল ১৯ হাজার ১৬৪ টন, কেরোসিন ১৩ হাজার ৯১৬ টন এবং মেরিন ফুয়েল এক হাজার ২৬ টন মজুত রয়েছে।
প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত সম্পর্কেও তথ্য দেন মন্ত্রী। তিনি জানান, দেশের ২৯টি গ্যাসক্ষেত্রের সর্বশেষ হালনাগাদ হিসাব অনুযায়ী মোট গ্যাস মজুত ২৯ দশমিক ৭৪ ট্রিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে ২২ দশমিক ১১ ট্রিলিয়ন ঘনফুট ইতোমধ্যে উত্তোলন করা হয়েছে। বর্তমানে অবশিষ্ট উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের পরিমাণ প্রায় ৭ দশমিক ৬৩ ট্রিলিয়ন ঘনফুট।
জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হলে সরকারের জন্য ভর্তুকি ও মূল্যসমন্বয়ের চাপ আরও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে বিপিসির আর্থিক সক্ষমতা ধরে রাখতে বিকল্প অর্থায়ন ও মূল্য নির্ধারণ কৌশল নিয়ে নতুন করে ভাবতে হতে পারে।
তবে সরকার বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম সহনীয় পর্যায়ে নেমে এলে দেশের বাজারেও মূল্য কমানোর বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। আপাতত ভোক্তাদের স্বস্তি দিতে লোকসান বহন করেই জ্বালানি সরবরাহ অব্যাহত রাখা হচ্ছে।

