তথ্যসংগ্রাহক ও প্রতিবেদক- এফ. আর. ইমরান
বিশ্বের সামরিক শক্তির সূচক গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ার ইনডেক্স ২০২৫-এ বাংলাদেশ ১৪৫টি দেশের মধ্যে ৩৫তম স্থানে উঠে এসেছে, যা গত বছরের ৩৭তম এবং ২০২৩ সালের ৪০তম অবস্থান থেকে উন্নয়ন করে। এ স্কোর Global Firepower 2025 Index অনুসারে ০.৬০৬২, যা সামরিক সক্ষমতার একটি ইতিবাচক নির্দেশক। দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ এখন ভারত, চীন ও পাকিস্তানের পরে রয়েছে এবং মিয়ানমারের (১৮তম) আগেই অবস্থান করছে।
এই র্যাংকিং ৬০টিরও বেশি মানদণ্ডের ভিত্তিতে তৈরি, যার মধ্যে রয়েছে জনশক্তি, অর্থনীতি, লজিস্টিক, ভূগোল ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম।
দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের সামরিক বাহিনী ধারাবাহিকভাবে শক্তিশালী ও আধুনিক হচ্ছে। সামরিক শক্তি বৃদ্ধির অংশ হিসেবে বাংলাদেশ “ফোর্স গোল ২০৩০” বাস্তবায়ন করছে, যার মূল উদ্দেশ্য হলো প্রতিরক্ষা বাহিনীকে আধুনিকায়ন, বৈচিত্র্যময় অস্ত্রভাণ্ডার গঠন এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন সক্ষমতা অর্জন।
জনশক্তি: বিশাল ও সক্রিয় বাহিনী-
-
মোট জনসংখ্যা: ১৬৫ মিলিয়ন বা ১৬,৮৬৯৭,১৮৪ জনেরও বেশি (বিশ্বে শীর্ষ ৩২)
-
সক্রিয় সেনা সদস্য: ১,৬৩,০০০ (বিশ্বে ৩৪তম)
-
প্যারামিলিটারি ফোর্স: প্রায় ৬৮ লাখ- (বিশ্বের সর্ববৃহৎ)
-
সামরিক বয়সে পৌঁছানো বার্ষিক জনসংখ্যা: ৩২ লাখ (বিশ্বে ৮ম)
-
রিজার্ভ বাহিনীর সংখ্যা: GFP তালিকায় আলাদা করে দেখানো হয়নি, তবে কার্যত বিশাল।
বিমানবাহিনী: সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও কার্যকর প্রস্তুতি-
-
বিমানবাহিনী জনবল: ১৭,০০০
-
মোট উড়োজাহাজ: ২১৪টি
-
ফাইটার জেট: ৪২টি (প্রধানত পুরনো J-7 ও FT-7)
-
কার্গো বিমান: ১৭টি (C-130J ও Antonov সহ)
-
হেলিকপ্টার: ৬৫টি (সক্রিয় ৪২)
-
ট্রেইনার বিমান: ৮৬টি
-
বিশেষ মিশন বিমান: ৪টি
-
-
ড্রোন: Bayraktar TB-2 (৬টি), Bramr C4I (৩৬টি), Falco UAV (২টি)
চ্যালেঞ্জ: বিমানে আধুনিক মাল্টিরোল ফাইটার বা উন্নত প্রযুক্তির অভাব রয়ে গেছে, তবে Yak-130 ও ড্রোন সক্ষমতা ভবিষ্যতের সম্ভাবনা দেখায়।
সেনাবাহিনী: শক্তিশালী সাঁজোয়া বহর ও অস্ত্রভাণ্ডার-
-
ট্যাংক: ৬৬২টি (উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি)
-
সাঁজোয়া যান: ১১,৫৮৪+ (APC, IFV, MRAP)
-
আর্টিলারি:
-
টাওড (টানা): ৫২২টি
-
স্বচালিত (SPG): ৭৯টি
-
রকেট আর্টিলারি (MRLS): ১১০টি
-
-
অস্ত্র ও প্রযুক্তি: চীনের টাইপ-৫৯ (দুর্জয়), রকেট লঞ্চার, অ্যান্টি-ট্যাংক অস্ত্র ও ইঞ্জিনিয়ারিং ব্রিগেড
বিশেষত্ব: BOF (বাংলাদেশ অস্ত্র কারখানা) থেকে রাইফেল ও গোলাবারুদ উৎপাদনে স্বনির্ভরতা।
নৌবাহিনী: ত্রিমাত্রিক নিরাপত্তায় অগ্রসর-
-
জনবল: ২৫,১০০
-
যুদ্ধজাহাজ: ১১৮টি
-
ফ্রিগেট: ৭টি
-
করভেট: ৬টি
-
সাবমেরিন: ২টি (চীনের মিং শ্রেণির)
-
পেট্রোল ভেসেল: ৬১টি
-
মাইন ওয়ারফেয়ার শিপ: ৫টি
-
-
নৌঘাঁটি: একটি সাবমেরিন ঘাঁটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন
ঘাটতি: কোনো ডেস্ট্রয়ার, এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার বা হেলিকপ্টার ক্যারিয়ার নেই, যা শক্তি প্রক্ষেপণে সীমাবদ্ধতা তৈরি করে।
অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও বাজেট-
-
সামরিক বাজেট: ৩.৬ বিলিয়ন ডলার (ভারত: ৭৩.৮ বিলিয়ন, পাকিস্তান: ৬.৩৪ বিলিয়ন)
-
ক্রয়ক্ষমতা সমতা (PPP): ১.৪১৩ ট্রিলিয়ন ডলার (বিশ্বে ২৩তম)
-
বৈদেশিক ঋণ: ৫১.৯৬৫ বিলিয়ন ডলার (বিশ্বে ৮৬তম)
সংকট: বাজেট তুলনামূলকভাবে ছোট হওয়ায় বড় অস্ত্র কেনা বা প্রযুক্তি স্থানান্তরে সীমাবদ্ধতা দেখা দেয়।
ভূগোল ও কৌশলগত দিক-
-
সুবিধা: নদীবহুল ও কৌশলগত অবস্থান প্রতিরক্ষায় সহায়ক
-
চ্যালেঞ্জ: অপারেশনাল লজিস্টিক এবং ইনফ্রাস্ট্রাকচার সীমাবদ্ধ
শক্তি ও দুর্বলতা: সামগ্রিক বিশ্লেষণ-
শক্তি:
-
বিশাল জনসংখ্যা ও প্যারামিলিটারি বাহিনী
-
উপকূলীয় অঞ্চলে সক্রিয় নৌ উপস্থিতি
-
ক্রমবর্ধমান বাজেট ও নিজস্ব অস্ত্র উৎপাদন ক্ষমতা
-
ফোর্স গোল ২০৩০-এর অধীনে আধুনিকীকরণের ধারাবাহিকতা
দুর্বলতা:
-
বিমানবাহিনীতে পুরনো ফ্লিট
-
নৌবাহিনীতে আধুনিক যুদ্ধজাহাজের ঘাটতি
-
উন্নত সাইবার, স্যাটেলাইট বা দূরপাল্লার প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির সীমিত উপস্থিতি
কৌশলগত লক্ষ্যপূরণে ধাপে ধাপে এগিয়ে চলছে বাংলাদেশ-
বাংলাদেশের সামরিক শক্তি জনশক্তি ও ভৌগোলিক অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠলেও, আধুনিক অস্ত্র ও প্রযুক্তিতে ধাপে ধাপে এগিয়ে যাচ্ছে দেশটি। ফোর্স গোল ২০৩০-এর অধীনে সব বাহিনীতেই প্রশিক্ষণ, অবকাঠামো ও প্রযুক্তি হালনাগাদের মধ্য দিয়ে একবিংশ শতাব্দীর উপযোগী সামরিক শক্তি গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করছে বাংলাদেশ।

