বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘সংস্কার’ শব্দটি নতুন নয়। স্বাধীনতার পর থেকেই রাজনীতিতে দুর্বৃত্তায়নের ছাপ স্পষ্ট। গণতন্ত্রের ভিত্তি মজবুত করতে তাই বারবার উঠে এসেছে রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক দলের কাঠামোগত সংস্কারের প্রশ্ন।
‘ওয়ান ইলেভেন’–এর পর এই আলোচনায় নতুন মাত্রা যুক্ত হয়। কেটে গেছে প্রায় দুই দশক। কিন্তু সমস্যাগুলো থেকেই গেছে। নতুন করে সেই আলোচনা তীব্র হয়েছে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন এবং শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পর। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের ফলশ্রুতিতে দেশে ফের একবার সামনে এসেছে সংস্কারের ডাক।
গণতন্ত্র রক্ষায় ও ফ্যাসিবাদ ঠেকাতে এবার গঠিত হয়েছে একাধিক কমিশন। কমিশনগুলো ইতিমধ্যে প্রতিবেদন ও সুপারিশ জমা দিয়েছে। মূল প্রস্তাব—রাষ্ট্রক্ষমতায় ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা, যাতে ক্ষমতা একজন ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত না হয়।
এই প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতা কমানো
- সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ প্রক্রিয়া বদল
- সংসদে দুই কক্ষের প্রস্তাব
- উচ্চকক্ষে অনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতি চালু
- সংবিধান সংশোধনে গণভোট বাধ্যতামূলক করা
এ সব বিষয় নিয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে একাধিক দফায় বৈঠক করেছে। তবে এখনো সর্বসম্মতি অর্জন সম্ভব হয়নি।
প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, সাংবিধানিক সংস্কারের প্রধান লক্ষ্য—
- ভবিষ্যতে যেন কোনো ফ্যাসিবাদী শাসন গড়ে না ওঠে
- রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ
- প্রতিষ্ঠানের শক্তিশালীকরণ ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা
প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা সীমিত করা, নিয়োগব্যবস্থার সংস্কার, সংবিধান সংশোধনে কঠোর শর্ত আরোপসহ বেশ কিছু মৌলিক বিষয় এতে অন্তর্ভুক্ত।
বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী, সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সম্মতিতে যেকোনো সংবিধান সংশোধন করা সম্ভব। এ ব্যবস্থায় সরকার দলীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার সুযোগে ইচ্ছেমতো সংবিধান পরিবর্তন করা যায়। এ অবস্থান পাল্টে নতুন প্রস্তাবে বলা হয়েছে—
- সংসদ হবে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট
- সংবিধান সংশোধনে উভয় কক্ষের দুই-তৃতীয়াংশ সম্মতি প্রয়োজন
- বিশেষ কিছু বিষয়ে গণভোট ছাড়া সংশোধন সম্ভব নয়
তবে এই বিষয়ে রাজনৈতিক ঐক্য এখনও গড়ে ওঠেনি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ প্রস্তাব বাস্তবায়ন না হলে আবারও কর্তৃত্ববাদ মাথাচাড়া দিতে পারে। ক্ষমতার ভারসাম্য, প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধিকার, জবাবদিহি—এ সবই এখন সময়ের দাবি।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের প্রস্তাবগুলো সেই কাঠামোই নির্দেশ করছে। কিন্তু এগুলো বাস্তবায়নের দায়িত্ব শুধু কমিশনের নয়, রাজনৈতিক দলগুলোকেই এগিয়ে আসতে হবে।
জাতীয় স্বার্থে সংস্কার নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর আন্তরিকতা অত্যন্ত জরুরি। মৌলিক সংস্কার ছাড়া শুধু নির্বাচন ও সরকার গঠন কোনো ফল দেবে না। বরং কর্তৃত্ববাদী শাসনের আশঙ্কা থেকেই যাবে।
গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার রক্ষায় মৌলিক সংস্কারই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

