স্বামীকে বহু বছর আগে হারিয়েছেন রাবেয়া বেগম। ট্রেন দুর্ঘটনায় বড় ছেলের মৃত্যুর পর ধীরে ধীরে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন অন্য সন্তানদের থেকেও। ৮০ বছর বয়সী এই নারী একসময় অর্ধাহারে দিন কাটাতে বাধ্য হন। ঠিক তখনই নিজের গ্রামে খুঁজে পান এমন এক জায়গা, যেখানে থাকা, খাওয়া, এমনকি পরনের কাপড় পর্যন্ত বিনামূল্যে মেলে।
গত ১২ বছর ধরে তিনি থাকছেন যশোরের সমসপুর গ্রামের ‘ওল্ড কেয়ার হোম’-এ, যেখানে আরো অনেক অসহায় মায়ের সঙ্গে কেটে যাচ্ছে তাঁর শান্তিময় দিন।
ভৈরব নদের পাড়ে পাঁচ বিঘা জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত এই বৃদ্ধাশ্রমটি গড়ে তুলেছেন জ্যোৎস্না মুখার্জি। এই প্রাকৃতিক পরিবেশঘেরা ‘ওল্ড কেয়ার হোম’ হয়ে উঠেছে জীবনের শেষ অধ্যায়ে অসহায় নারীদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়।
উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা আশিকুজ্জামান তুহিন একাধিকবার প্রতিষ্ঠানটি পরিদর্শন করেছেন। তিনি বলেন, “প্রকৃতির মাঝে এমন বৃদ্ধাশ্রমে থেকে মায়েদের মনেও প্রশান্তি আসে। এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসার যোগ্য।”
‘ওল্ড কেয়ার হোম’-এর একদিন-
যশোর শহর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরের মান্দারতলা বাজার পার হয়ে ভৈরব নদ পার করলেই মেলে সমসপুর গ্রামের অবস্থান। সেখানেই একটি এল-আকৃতির একতলা ভবনে ছয়টি কক্ষ, রান্নাঘর, চারটি শৌচাগারসহ রয়েছে আলাদা প্রার্থনাকক্ষ, দুটি টিভি, বৈদ্যুতিক সংযোগ এবং সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা। পাশেই রয়েছে আরো তিনটি কক্ষবিশিষ্ট টিনের ঘর।
বর্তমানে সেখানে ২০ জন মা থাকেন। তাঁরা কেউ ‘আম্মু’ কেউ ‘খালা’ বলে ডেকে থাকেন জ্যোৎস্না মুখার্জিকে। তিনবেলা খাবার, জামা-কাপড়, জুতা, সাবান, টুথব্রাশ-পেস্ট, ওষুধ সবকিছুই নিয়মিত মেলে। চারজন চিকিৎসক মোবাইলে নিয়মিত পরামর্শ দেন, মাঝে মাঝে চিকিৎসাশিবিরও হয়।

টিনের ছাউনি থেকে পাকা ভবন-
১৯৯৮ সালে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে স্বামীর সঙ্গে গিয়েছিলেন জ্যোৎস্না মুখার্জি। সেখানকার তিনটি বৃদ্ধাশ্রম দেখে নিজের গ্রামে এমন কিছু গড়ার স্বপ্ন দেখেন। ২০০১ সালে স্বামীর মৃত্যুতে কিছুটা থমকে গেলেও ২০০৮ সালে গ্রামের অসহায় বৃদ্ধাদের সেবা শুরু করেন তিনি। ২০১০ সালে বাবা বিশ্বনাথ গাঙ্গুলী পাঁচ বিঘা জমি লিখে দেন মেয়েকে, যা হয়ে ওঠে বৃদ্ধাশ্রমের ভিত্তি।
২০১২ সালে প্রথম ছয়টি টিনের ছাউনি কক্ষ তৈরি হয়। পরের বছরই আশ্রয় পান ৪০ জন মা। ২০১৪ সালে এটি সমাজসেবা অধিদপ্তরের নিবন্ধন পায়। এরপর জেলা পরিষদ ও উপজেলা পরিষদের সহযোগিতায় নতুন কক্ষ নির্মিত হয়। বর্তমানে ছয়টি কক্ষে ছাদ রয়েছে।
আনন্দের মধ্যেই কাটে দিন-
আবাসিকদের মধ্যে রয়েছেন ঝিনাইদহের আম্বিয়া বেগম (৬৮) ও মুরাদগড়ের রোকেয়া বেগম (৭৫)। তাঁদের ভাষায়, এখানকার পরিবেশ শান্তিপূর্ণ, সুযোগ–সুবিধার অভাব নেই। নিয়মিত গল্প, গান, অনুষ্ঠান ও টিভি দেখার পাশাপাশি বছরে দুইবার বাইরে ঘুরতে যাওয়া হয়। নদের পাড়ে তৈরি টি হাউসে মাসে এক–দুবার হয় আড্ডা ও খাবারের আয়োজন। দাফনের জন্য আট শতক জমিও কিনে রাখা হয়েছে, যদি কোনো বাসিন্দার আত্মীয় না থাকে।
নিজস্ব আয়েই চলে খরচ-
জ্যোৎস্না মুখার্জির মোবাইল ব্যবসা না থাকলেও বর্তমানে বাজারে ভুসিমাল ব্যবসা ও বাড়িভাড়ার আয় রয়েছে। সেইসঙ্গে বৃদ্ধাশ্রমের জমিতে সবজি, ফল, বাঁশ, গরু, ছাগল, মুরগি, হাঁস ও কবুতরের চাষ থেকেও আয় হয়। মাঝে মাঝে কিছু অনুদান মেলে, জেলা প্রশাসন থেকে কিছু চালও পাওয়া যায়।
স্থানীয় তিনজন নারী নামমাত্র সম্মানীতে দেখাশোনা করেন আশ্রমটি। মাসিক গড় খরচ ২০ হাজার টাকা। বাসিন্দারা নিজেরাও রান্না ও পরিষ্কারে সহায়তা করেন।
ভবিষ্যতের স্বপ্ন-
সীমানাপ্রাচীর না থাকায় কিছুটা উদ্বেগে থাকলেও জ্যোৎস্না মুখার্জির স্বপ্ন আরো বড়। ভবিষ্যতে নদের পাড়ে দুই কক্ষের ভবন গড়ে বৃদ্ধ বাবাদের জন্যও স্থান তৈরি করতে চান তিনি।
সমসপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হাশেম আলী বলেন, “অজপাড়াগাঁয়ে এমন সুন্দর একটি বৃদ্ধাশ্রম বিরল। এখানে থাকতে মায়েদের কিছুই লাগে না, সবকিছুই দেওয়া হয়। এটা আমাদের গর্বের বিষয়।”

