দেশে প্রথমবারের মতো সাভারকে ‘ডিগ্রেডেড এয়ারশেড’ হিসেবে ঘোষণা করেছে সরকার। সাধারণভাবে, বাতাসে দূষণের মাত্রা যদি প্রতি ঘনমিটারে ৫ মাইক্রোগ্রাম থাকে, মানুষ তা সহজে গ্রহণ করতে পারে। কিন্তু সাভারের বাতাসে এই মান প্রায় ২০ গুণ বেশি। বছরের ৩৬৫ দিনের মধ্যে ১৬০ দিনের বেশি সময়ে সাভারের বাতাসে দূষণের মাত্রা অতিরিক্ত রেকর্ড করা হয়েছে।
পাশের উপজেলা ধামরাইয়েও দূষণ বাড়ছে। দুই উপজেলায় মিলিয়ে ২৭২টি অবৈধ ইটভাটা আছে। এই ইটভাটার ধোঁয়ায় ঢাকার বাতাসও দূষিত হচ্ছে। জানা গেছে, গত ১৭ আগস্ট রবিবার রাতে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অধীন পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. কামরুজ্জামান স্বাক্ষরিত এক পরিপত্রের মাধ্যমে এ ঘোষণা জারি করা হয়েছে।
বায়ুদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০২২-এর বিধি ৫ অনুযায়ী, ঢাকা জেলার সাভার উপজেলাকে ‘ডিগ্রেডেড এয়ারশেড’ ঘোষণা করা হয়েছে। এর মাধ্যমে আগামী সেপ্টেম্বর থেকে টানেল ও হাইব্রিড হফম্যান কিলন ছাড়া সব ধরনের ইটভাটায় ইট পোড়ানো ও প্রস্তুত কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। এতে সেপ্টেম্বর থেকে ১০৭টি ইটভাটা বন্ধ হবে। এছাড়া উন্মুক্ত অবস্থায় কঠিন বর্জ্য পোড়ানোও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
নির্মিতব্য শিল্প-কারখানার জন্য অবস্থানগত ও পরিবেশগত ছাড়পত্র দেওয়াও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে নতুন পরিকল্পনা করা হচ্ছে, যার মাধ্যমে ভবিষ্যতে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। জনস্বার্থে আদেশটি অবিলম্বে কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মানদণ্ড অনুসারে পরিবেষ্টক বাতাসের মান বছরে প্রতি ঘনমিটারে ৩৫ মাইক্রোগ্রাম থাকা উচিত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সর্বশেষ মানদণ্ড অনুযায়ী এটি ৫ মাইক্রোগ্রাম।
সার্বক্ষণিক বায়ুমান পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, সাভারের বাতাসে এই মুহূর্তে দূষণের মাত্রা ডব্লিউএইচওর মানদণ্ডের চেয়ে ২০ গুণ বেশি। দেশের মানদণ্ড অনুসারে বার্ষিক মানদণ্ডের তিনগুণ ছাড়িয়ে গেছে। প্রতিদিনের জন্য বাতাসের মান প্রতি ঘনমিটারে ৬৫ মাইক্রোগ্রাম থাকা উচিত। কিন্তু ২০২৩ সালে ১৬৪ দিন, ২০২৪ সালে ১৬০ দিনের বেশি সময় এই মান ছাড়িয়েছে।
বায়ুদূষণের অন্যতম উপাদান হলো কালো ধোঁয়া। ঢাকার বাতাসে প্রতি ঘনমিটারে ৬-৮ মাইক্রোগ্রাম কালো ব্ল্যাক কার্বন বা কালো ধোঁয়া রয়েছে। উন্নত বিশ্বের শহরে মাত্র ০.৫-০.৮ মাইক্রোগ্রাম। ফলে রাজধানীর বাতাসে ৭-১১ গুণ বেশি কালো ধোঁয়া বিরাজমান। কালো ধোঁয়া সবচেয়ে বেশি ইটভাটার ধোঁয়া থেকে নির্গত হয়।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বায়ুদূষণ মানুষ ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। কালো ধোঁয়া নাকে প্রবেশ করে রক্তে মিশে নানা রোগের কারণ হয়। এটি মৃত্যুর পাশাপাশি চিকিৎসা ব্যয়ও বাড়াচ্ছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (বায়ুমান ব্যবস্থাপনা) মো. জিয়াউল হক বলেন, “মানুষের স্বাস্থ্যের বিষয়টি বিবেচনা করে সাভারকে ‘ডিগ্রেডেড এয়ারশেড’ ঘোষণা করা হয়েছে। বাংলাদেশ ইট প্রস্তুতকারক মালিক সমিতি একমত পোষণ করেছে। দেশের মানদণ্ড অনুযায়ী সাভারের বাতাস তিনগুণ খারাপ, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ২০ গুণ বেশি দূষিত। এই উদ্যোগ সাভার ও ঢাকার বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হবে এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষিত হবে।”
সাভার ও ধামরাইয়ের বায়ু রাজধানীতে কিভাবে প্রবেশ করছে, জানতে চাইলে তিনি বলেন, “শুষ্ক মৌসুমে প্রায় পাঁচ মাস উত্তর-পশ্চিম ও উত্তর-পূর্ব থেকে দক্ষিণ-পূর্ব ও দক্ষিণ-পশ্চিমে বায়ু প্রবাহিত হয়। এতে সাভারের বায়ুদূষণ ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় প্রবেশ করে এবং ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে।”
বৈশ্বিক মানদণ্ড অনুযায়ী, বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত দেশের মধ্যে বাংলাদেশ শীর্ষে। দেশে গড় দূষণ ১০০ পিএম ২.৫ পর্যন্ত ওঠানামা করে। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ দূষিত দেশের অবস্থান ধরে রেখেছে। সুইজারল্যান্ডভিত্তিক ওয়েবসাইট ‘আইকিউ এয়ার’-এর তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার বায়ুর মান সূচক ৩০০-৪০০। একিউআই মান ০-৫০ হলে বাতাস ভালো, ২০১-৩০০ হলে খুব অস্বাস্থ্যকর, ৩০১-৫০০ হলে বিপজ্জনক। বিপজ্জনক মাত্রার বাতাসে রেড এলার্ট জারি হয়।
স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) চেয়ারম্যান আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, “ঢাকার বায়ুদূষণের জন্য সাভার ছাড়াও গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ দায়ী। পরিপত্রের বাধ্যবাধকতা সব এলাকায় প্রযোজ্য, কিন্তু তা মানা হচ্ছে না বা বাস্তবায়নে ঘাটতি আছে। প্রাথমিকভাবে সাভারকে পাইলট হিসেবে নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়েছে, যা সাধুবাদযোগ্য।”

