নতুন বেতন কাঠামো পুরোপুরি কার্যকর হলে আগামী পাঁচ বছরে সরকারি কর্মচারীদের পেনশন ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ৫১ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি পৌঁছাবে। জাতীয় বেতন কমিশন সতর্ক করে বলেছে, এতে জাতীয় বাজেটে ‘অসহনীয়’ আর্থিক চাপ তৈরি হতে পারে। এই চাপ সামলাতে কমিশন বর্তমান পেনশন কাঠামো থেকে সরে এসে নতুন নিয়োগপ্রাপ্তদের জন্য চাঁদাভিত্তিক ব্যবস্থা চালুর সুপারিশ করেছে।
কমিশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গড়ে প্রতিবছর প্রায় ৪ দশমিক ৫ শতাংশ হারে পেনশনভোগীর সংখ্যা বেড়েছে। ২০১৫ সালের বেতন কাঠামোর হিসাবে গত অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে পেনশন খাতে ব্যয় হয়েছে ১২ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা। সেই হিসাবে পুরো বছরের ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ২৪ হাজার ৬৭০ কোটি টাকা।
নতুন কাঠামো পুরোপুরি কার্যকর হলে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৯ লাখ ১৬ হাজার পেনশনভোগীর জন্য বার্ষিক ব্যয় বেড়ে হবে ৩৪ হাজার ৬২৯ কোটি টাকা। ২০২৯-৩০ অর্থবছরে পেনশনভোগীর সংখ্যা ১০ লাখ ৪৫ হাজারে পৌঁছাতে পারে, আর ব্যয় গিয়ে ঠেকবে ৫০ হাজার ৬৮৪ কোটি টাকায়। অর্থাৎ বর্তমান ব্যয়ের তুলনায় এটি দ্বিগুণের বেশি।
কমিশনের ভাষ্য, পেনশনের দাবি মেটাতে ক্রমবর্ধমান ব্যয় ইতিমধ্যেই বাজেটের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। দীর্ঘ মেয়াদে এই চাপ অসহনীয় পর্যায়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। এ কারণে টেকসই সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছে কমিশন। তাদের মতে, অবসরপ্রাপ্তদের গড় আয়ু বাড়ায় এখন অনেকে ২০ বছর বা তারও বেশি সময় ধরে পেনশন পাচ্ছেন। ফলে সরকারের দায়ও দীর্ঘ হচ্ছে।
বাংলাদেশে সরকারি কর্মচারীদের জন্য চালু আছে সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নের ‘ডিফাইন্ড বেনিফিট’ বা নির্ধারিত সুবিধাভিত্তিক পেনশন ব্যবস্থা। চাকরির সময় কর্মচারীদের কোনো চাঁদা দিতে হয় না। পুরো দায় মেটে সরকারের রাজস্ব তহবিল থেকে। অবসরের পর সর্বশেষ মূল বেতনের ৯০ শতাংশের ভিত্তিতে মাসিক পেনশন মেলে। সঙ্গে থাকে অবসর-পরবর্তী ছুটির সুবিধা। প্রায় ৯০টি স্বায়ত্তশাসিত ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানেও একই ধরনের ব্যবস্থা আছে, যার মধ্যে ৫৫টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। এসব প্রতিষ্ঠানের পেনশন ব্যয়ের বড় অংশ সরকারি অনুদান থেকে আসে। কমিশনের মতে, আগামী বছরগুলোয় এই ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়াসহ অধিকাংশ উচ্চ আয়ের দেশ এবং বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশগুলো ইতিমধ্যে ‘ডিফাইন্ড কন্ট্রিবিউশন’ বা নির্ধারিত চাঁদাভিত্তিক ব্যবস্থায় গেছে। এতে কর্মচারী ও নিয়োগদাতা, দুই পক্ষের চাঁদায় একটি তহবিল গড়ে ওঠে। সেই অর্থ সরকারি সিকিউরিটিজ, শেয়ারবাজার ও মিউচুয়াল ফান্ডের মতো কম ঝুঁকির খাতে বিনিয়োগ করা হয়। পরে তহবিল ও বিনিয়োগ-আয় থেকে পেনশন দেওয়া হয়।
কমিশনের দেওয়া তুলনায় দেখা যায়, শ্রীলঙ্কায় কর্মচারীরা বেতনের ৮ শতাংশ এবং সরকার ১২ শতাংশ চাঁদা দেয়। পাকিস্তানে কর্মচারীদের চাঁদা ১০ শতাংশ, সরকারের ১২ শতাংশ। ভারতে কর্মচারীরা দেন ১০ শতাংশ, সরকার ১২ থেকে ১৪ শতাংশ। অস্ট্রেলিয়ায় বেতনের অন্তত ১২ শতাংশ পেনশন তহবিলে জমা বাধ্যতামূলক। ২০২৫ সালে দেশটির পেনশন সম্পদের পরিমাণ ছিল ৪ দশমিক ৩৩ ট্রিলিয়ন অস্ট্রেলীয় ডলার, যা বিশ্বের বৃহত্তম তহবিলগুলোর একটি।
কমিশন বলছে, সরকারি কর্মচারীরা গড়ে ৩০ বছর বা তারও বেশি চাকরি করেন। তাই চাঁদাভিত্তিক ব্যবস্থা চালু হলে এই তহবিল দেশের পুঁজিবাজার ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বড় চালিকাশক্তি হতে পারে। ১৭ কোটি মানুষের দেশে সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি খাতের কর্মীদের একটি অভিন্ন চাঁদাভিত্তিক ব্যবস্থার আওতায় আনা গেলে বিপুল দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ তহবিল গড়ে উঠবে। এতে সামাজিক সুরক্ষাও জোরদার হবে।
তবে এই পথ আগেও মসৃণ ছিল না। ২০২৩ সালের সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থাপনা আইনের আওতায় সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের নতুন কর্মীদের জন্য চাঁদাভিত্তিক ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তা বাধার মুখে পড়ে। সরকারি কর্মচারীদের এই ব্যবস্থার বাইরে রাখা হয়েছিল, আর সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গেও পর্যাপ্ত আলোচনা হয়নি।
এবার কমিশন জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষকে অংশীজনদের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করে নতুন সরকারি কর্মচারী ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের জন্য পৃথক চাঁদাভিত্তিক ব্যবস্থা চালুর সুপারিশ করেছে। নতুন নিয়োগ পাওয়া সব সরকারি কর্মচারীর জন্য এটি বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এতে বেতন থেকে নির্দিষ্ট অর্থ কাটা হবে এবং সরকারও সমপরিমাণ অর্থ জমা দেবে। এই অর্থে গঠিত হবে আলাদা পেনশন তহবিল। সেই তহবিল সরকারি সিকিউরিটিজ, শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ডের মতো নিরাপদ ও লাভজনক খাতে বিনিয়োগ করা হবে। বিনিয়োগ-আয় দিয়ে তহবিলকে স্বনির্ভর করার পরিকল্পনা নিতে বলেছে কমিশন। জনগ্রহণযোগ্যতা ও আর্থিক ভারসাম্য বজায় রাখতে নিয়মিত পর্যালোচনার সুপারিশও আছে। পাশাপাশি সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি খাতের কর্মীদের জন্য তহবিলভিত্তিক পেনশন সম্প্রসারণে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব ও কার্যপরিধি বাড়ানোরও সুপারিশ করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে কমিশনের সতর্কবার্তা স্পষ্ট। বেতন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত যেমন কর্মচারীদের জন্য স্বস্তির, তেমনি এর দীর্ঘ মেয়াদি আর্থিক দায় বাজেটের জন্য বড় পরীক্ষা। এখন দেখার বিষয়, সরকার কতটা দ্রুত ও কীভাবে চাঁদাভিত্তিক ব্যবস্থায় যেতে পারে এবং আগের মতো আপত্তির মুখে পড়ে কি না। বিশেষ করে অংশীজনদের আস্থা অর্জন করা গেলেই এই সংস্কার টেকসই হবে।

