বৈশ্বিক উন্নয়ন সহযোগীরা জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক প্রকল্পে অর্থায়নে রাজি না হওয়ায় মাতারবাড়ী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দ্বিতীয় পর্যায় বাস্তবায়নে বিকল্প পথ খুঁজছে সরকার। এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াটের এই প্রকল্পে প্রায় ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের অর্থ জোগাড়ে দেশীয় সুকুক, আন্তর্জাতিক ডলার বন্ড, রপ্তানি ঋণ সংস্থার (ইসিএ) অর্থায়ন এবং রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টিযুক্ত অন্যান্য ঋণের বিকল্প যাচাই করা হচ্ছে।
প্রকল্পের বাস্তবায়নকারী সংস্থা কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড গত সপ্তাহে বিদ্যুৎ বিভাগে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব জমা দিয়েছে। প্রস্তাব হাতে পাওয়ার পর অর্থায়নের কাঠামো মূল্যায়নে ১৯ অক্টোবর অর্থ বিভাগের সঙ্গে বৈঠকে বসে বিদ্যুৎ বিভাগ। ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজারবিষয়ক প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী তানভীর গনি।
২০ অক্টোবর বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব মিরানা মাহরুখ জানান, কৌশল চূড়ান্ত করার আগে ঋণের ব্যয় এবং বিদ্যুতের দামের ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাব সতর্কভাবে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। তাঁর ভাষ্য, দেশীয় ব্যাংকগুলো উচ্চ সুদে বিনিয়োগে আগ্রহী হওয়ায় স্থানীয় সুকুকের মাধ্যমে ১ থেকে ২ বিলিয়ন ডলার তোলা সম্ভব। তবে টাকায় ঋণ নিলে বিনিময় হারের বড় ঝুঁকি থাকে। আমদানির ব্যয় মেটাতে টাকাকে বৈদেশিক মুদ্রায় রূপান্তরের সময় টাকার অবমূল্যায়ন হলে প্রকল্পের মোট ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে। এ ছাড়া উচ্চ সুদের কারণে খরচ বাড়লে তার চাপ গিয়ে পড়বে বিদ্যুতের ট্যারিফে। এ কারণেই সরকার বেশ সতর্কভাবে এগোচ্ছে। অর্থায়নের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আগামী মাসের শুরুতে আসতে পারে বলে জানান তিনি।
বিদ্যুৎ বিভাগ ও সিপিজিসিএলের কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন, বিবেচনায় আছে চারটি পথ। এগুলো হলো দেশীয় সুকুক ইস্যু, সার্বভৌম ডলার বন্ড, ইসিএ অর্থায়ন এবং ইন্টেরিম পেমেন্ট সার্টিফিকেটভিত্তিক তহবিল। ইসিএ ব্যবস্থায় প্রকল্পের কেনাকাটায় সহায়তা দিতে সরকারি গ্যারান্টিযুক্ত ঋণ, নিশ্চয়তা বা বিমা সুবিধা ব্যবহৃত হয়। আর আইপিসিভিত্তিক কাঠামোয় কাজের প্রত্যয়িত অগ্রগতির বিপরীতে ঠিকাদারদের স্বল্পমেয়াদি তারল্য জোগানো হয়।
প্রকল্পটি মূলত মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির ওপর নির্ভরশীল। তাই বিনিময় হারের অস্থিরতা এড়াতে সরকার বৈদেশিক মুদ্রায় অর্থায়নকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। প্রায় ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ ১৬ থেকে ১৭ হাজার কোটি টাকার এই ব্যয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ যাবে যন্ত্রপাতি আমদানিতে, যার পুরোটাই বৈদেশিক মুদ্রায়। বাকি ২০ শতাংশ টাকায় ব্যয় হবে স্থানীয় ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ ও শ্রমিকের মজুরিতে।
সময়ের হিসাবও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের লক্ষ্য, ২০৩০ সালের জুনের মধ্যে কেন্দ্রের প্রথম ইউনিট চালু করা। এই লক্ষ্য ধরে রাখতে সময়মতো অর্থায়নের সিদ্ধান্ত জরুরি। কর্মকর্তারা বলছেন, গত গ্রীষ্মে ভারত থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটেছিল। সীমিত এলএনজি পুনঃগ্যাসীকরণ সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দামের ওঠানামায় গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোও সংকটে পড়ে। তাই দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন স্থিতিশীল রাখতে যত দ্রুত সম্ভব প্রকল্পটি শেষ করার নীতিগত তাগিদ রয়েছে।
ব্যয়ের দিক থেকে দ্বিতীয় পর্যায় অনেক সাশ্রয়ী হবে বলে আশা করছে বিদ্যুৎ বিভাগ। কারণ মূল অবকাঠামো ইতিমধ্যে চালু। প্রথম পর্যায়ে বন্দর, সড়ক, কয়লা সংরক্ষণাগার ও বিদ্যুৎ সঞ্চালন অবকাঠামোয় বিপুল অর্থ খরচ হওয়ায় মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছিল ৫৭ হাজার কোটি টাকা। সেখানে দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রাক্কলিত ব্যয় ১৬ থেকে ১৭ হাজার কোটি টাকা। বর্তমান প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, প্রথম পর্যায়ের তুলনায় মূলধনী ব্যয় কমবে ৭০ থেকে ৭২ শতাংশ।
পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো প্রস্তাবে বিদ্যুৎ বিভাগ বলেছে, আগের অবকাঠামো যৌথভাবে ব্যবহারের সুযোগ থাকায় দ্বিতীয় পর্যায় অত্যন্ত লাভজনক ও বাস্তবসম্মত। প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণ ও উন্নয়ন আগেই শেষ হয়েছে। কয়লা খালাসের জেটি, স্টকইয়ার্ড, সঞ্চালন লাইন ও সাবস্টেশনও ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত। পরিবেশ অধিদপ্তরও পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন প্রতিবেদনে ছাড়পত্র দিয়েছে।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম বলেন, বিদ্যমান অবকাঠামো বিবেচনায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রে কয়লা এখনো নির্ভরযোগ্য মাধ্যম। তাঁর মতে, প্রথম পর্যায়েই মূল কাঠামো তৈরি হয়ে যাওয়ায় বন্দর সুবিধা, সঞ্চালন লাইন ও সাবস্টেশন পুরোপুরি প্রস্তুত। ফলে দ্বিতীয় পর্যায় হবে অত্যন্ত সাশ্রয়ী।
প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নিতে গত ২২ সেপ্টেম্বর অনুমোদিত বিশেষ বার্ষিক ক্রয়পরিকল্পনার আওতায় পরামর্শক সেবার জন্য ১১৮ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছে সিপিজিসিএল।
প্রকল্পের পথচলা অবশ্য মসৃণ ছিল না। ২০২২ সালে জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি অর্থায়ন থেকে সরে গেলে এটি স্থগিত হয়ে যায়। পরে প্রকল্পটি আবার সচল করা হয়। গত বছরের ২০ এপ্রিল বিদ্যুৎ বিভাগ পরিকল্পনা কমিশন ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে প্রাথমিক প্রস্তাব জমা দেয়। ২৫ মে পরিকল্পনা কমিশন প্রকল্পের রূপরেখা অনুমোদন করে অর্থায়ন নিশ্চিতে তা অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে পাঠায়।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যোগাযোগ করা হলেও কয়লাভিত্তিক প্রকল্পে অর্থায়নে বৈশ্বিক নিষেধাজ্ঞার কারণে বড় আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো যুক্ত হতে রাজি হয়নি। এর মধ্যে আছে বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল, জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন, এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংক অব কোরিয়া, নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক ও ইডিসিএফ।
অন্যদিকে একই সময়ে কাতার, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়াসহ কয়েকটি দেশ কেন্দ্র নির্মাণে অযাচিত প্রস্তাব জমা দিয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগ প্রতিযোগিতামূলক আন্তর্জাতিক দরপত্রের পক্ষে হলেও সময়সীমার চাপকে বড় চ্যালেঞ্জ মনে করছে। একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার ভাষ্য, স্বাভাবিক দরপত্রে মাসের পর মাস ব্যয় করে পরে সরাসরি আলোচনায় গেলে নির্মাণ দুই বছর পর্যন্ত পিছিয়ে যেতে পারে। তাই ২০৩০ সালের লক্ষ্য ধরে রাখতে শেষ পর্যন্ত এসব প্রস্তাব মূল্যায়নেই যেতে হতে পারে সরকারকে।
প্রকল্পটি এগোচ্ছে কয়লা থেকে সরে আসার বৃহত্তর প্রেক্ষাপটের মধ্যেই। পরিবেশবান্ধব জ্বালানির দিকে রূপান্তরের অংশ হিসেবে ২০২১ সালে সরকার ৮ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটের বেশি সক্ষমতার ১০টি প্রস্তাবিত কয়লা প্রকল্প বাতিল করেছিল। সেই অবস্থান থেকে মাতারবাড়ীর সম্প্রসারণে এগোনো নীতিগত দিক থেকে একটি স্পর্শকাতর সিদ্ধান্ত। এখন দেখার বিষয়, সুকুক, ডলার বন্ড কিংবা ইসিএ, কোন পথে অর্থ জোগাড় হয় এবং তার ব্যয়ের চাপ শেষ পর্যন্ত বিদ্যুতের দামে কতটা পড়ে।

