নারায়ণগঞ্জের দেওভোগ পানির ট্যাংকি এলাকার বাসিন্দা সজীব হোসেন হঠাৎ এক ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন। তাঁর শিশু কন্যা সানজিদা আক্তার সাফরিন, স্থানীয় ২৯ নম্বর আদর্শ বালক ও বালিকা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশু শ্রেণির শিক্ষার্থী, আগে থেকেই কিছুটা অসুস্থ ছিল। কিন্তু এক রাতে জ্বর ও বমির কারণে প্রচণ্ড দুর্বল হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে যায় সে।
সঙ্গে সঙ্গেই বাবা মেয়েকে মহাখালীর ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কোভিড-১৯ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে পরীক্ষায় ধরা পড়ে, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে সাফরিনের প্লাটিলেট নেমে গেছে এক হাজারের নিচে। পরিবারের কাছে এটি ছিল এক ভয়ানক দুঃসংবাদ।
চিকিৎসকদের নিবিড় তত্ত্বাবধানে কয়েকদিন পর সাফরিনের প্লাটিলেট বেড়ে দাঁড়ায় ৪২ হাজারে। যদিও পরিবারে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে, তবে শঙ্কা এখনও কাটেনি। সজীব হোসেন জানান, মেয়ের প্রথমে জ্বর, পরে বমি এবং শেষে বমির সঙ্গে রক্ত যেতে শুরু করে। তখনই তারা বুঝতে পারেন পরিস্থিতি মারাত্মক।
ডেঙ্গুর ভয়াবহতা বাড়ছে পরিসংখ্যানে-
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ২১ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ওইদিনই ডেঙ্গুতে ১২ জনের মৃত্যু হয় এবং নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হন ৭৭৪ জন। জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে মোট ৪১ হাজার ৮৩১ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে ১৭৯ জন মারা গেছেন।
বরিশাল বিভাগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি—১২ হাজার ১৭০ জন। এরপর চট্টগ্রামে ৬ হাজার ৪১২, ঢাকায় ৬ হাজার ১০৭, রাজশাহীতে ২ হাজার ৮১৬, খুলনায় ২ হাজার ১৩১, ময়মনসিংহে ৮৬৫, রংপুরে ২৮১ এবং সিলেটে ১২৩ জন আক্রান্ত হয়েছেন। শুধু ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন এলাকায় আক্রান্ত হয়েছেন ৪ হাজার ৪৭০ জন এবং দক্ষিণে ৬ হাজার ৪৫৬ জন।
হাসপাতালে রোগীদের হাহাকার-
ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কোভিড-১৯ হাসপাতালের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরছে। ২০ সেপ্টেম্বর সেখানে নতুন ভর্তি হয়েছেন ৭৩ জন। বছরের শুরু থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভর্তি হয়েছেন মোট ৭ হাজার ৮১২ জন। এ সময়ের মধ্যে মারা গেছেন ৯২ জন, আর চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরেছেন ৭ হাজার ২৫২ জন। এখনও ভর্তি আছেন ৪৬৮ জন রোগী।
এই হাসপাতালের শিশু রোগীদের একজন গাজীপুরের রিয়া মনি, বয়স মাত্র ৮ বছর। পাঁচ দিন ধরে সে চিকিৎসা নিচ্ছে। তার বাবা রুবেল আহমেদ জানান, প্রথমে জ্বর নাপা খাওয়ালে কমে যায়, কিন্তু এক সপ্তাহ পর আবার তীব্র জ্বর ওঠে। স্থানীয় হাসপাতালে পরীক্ষার পর ডেঙ্গু শনাক্ত হলে তাকে মহাখালীতে পাঠানো হয়।
একই হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন মো. সুমন আখন্দ (৪৫), যিনি রাজধানীর উত্তর বাড্ডার বাসিন্দা। তিনদিন জ্বরে ভুগে এবং পরে প্রচণ্ড পেটব্যথা ও বমি নিয়ে তিনি ভর্তি হন। পরীক্ষা করে ডেঙ্গু পজিটিভ ধরা পড়ে। যদিও এখন জ্বর নেই, কিন্তু শরীর ব্যথা ও দুর্বলতা রয়েই গেছে।
চিকিৎসকদের সতর্কবার্তা-
হাসপাতালের নিউরোলজি বিভাগের কনসালটেন্ট ডা. এস এম হাবিবুর রহমান হাবিব বলেন, গত কয়েক সপ্তাহে রোগীর সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। প্রথম দিকে চিকুনগুনিয়ার রোগী বেশি থাকলেও জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। রোগীদের মধ্যে সাধারণত জ্বর, শরীর ব্যথা, পেটে ব্যথা, ডায়রিয়া ও বমি বেশি দেখা যাচ্ছে।
তিনি জানান, তরুণরা প্রায়শই জ্বরকে অবহেলা করেন। পাঁচ থেকে ছয় দিন পর যখন অবস্থা জটিল হয়ে পড়ে, তখন তারা চিকিৎসকের কাছে যান। ততক্ষণে অনেক সময় পরিস্থিতি গুরুতর হয়ে যায়।
চিকিৎসকের মতে, নারায়ণগঞ্জ থেকে সবচেয়ে বেশি রোগী আসছেন। এছাড়া বরিশাল, বরগুনা, পিরোজপুর থেকেও কিছু রোগী আসছেন। তবে ঢাকার ভেতর ও আশপাশের জেলা থেকেই অধিকাংশ রোগী ভর্তি হচ্ছেন। তিনি পরামর্শ দেন, জ্বর, শরীর ব্যথা, মাথাব্যথা বা পাতলা পায়খানা হলে অবশ্যই দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়ে ডেঙ্গু টেস্ট করাতে হবে।
ডা. হাবিব আরও বলেন, ‘‘ডেঙ্গু আসলে খুব জটিল রোগ নয়, আবার এটিকে হালকাভাবে নেওয়ারও সুযোগ নেই। সচেতন থাকলে সহজেই সেরে ওঠা যায়, কিন্তু অবহেলা করলে প্রাণঘাতী হতে পারে।’’
গ্রামে ডেঙ্গুর বিস্তারের কারণ-
ঢাকার বাইরে বিশেষ করে গ্রামীণ অঞ্চলে ডেঙ্গুর বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। রোগীদের অভিজ্ঞতায় জানা যায়, জ্বর তিন থেকে পাঁচ দিন থাকে, শেষদিকে কমে আসে। তবে অনেকের হঠাৎ রক্তচাপ কমে যায়। কেউ কেউ বমি করেন, এমনকি রক্তও যায়।
কুমিল্লার এক উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, দীর্ঘ বর্ষাকাল ডেঙ্গুর বিস্তারের অন্যতম কারণ। বর্ষায় পানি জমে থাকে, কিন্তু গ্রামীণ এলাকায় সিটি কর্পোরেশনের মতো নিয়মিত জীবাণুনাশক স্প্রে ব্যবহার করা হয় না। এর ফলে মশা বাড়ছে। তাছাড়া গ্রামীণ মানুষের সচেতনতার অভাবও এ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে।
তিনি বলেন, ডেঙ্গুর প্রাথমিক লক্ষণ হলো হঠাৎ তীব্র জ্বর, শরীরের তাপমাত্রা ১০৪ ডিগ্রি পর্যন্ত উঠে যাওয়া এবং শরীরব্যথা। এসব উপসর্গ দেখা দিলে অবিলম্বে ডেঙ্গু পরীক্ষা করা উচিত। পরীক্ষায় ডেঙ্গু পজিটিভ হলে প্লাটিলেট কমে যায়, সঙ্গে মাথাব্যথা ও বমির উপসর্গ দেখা দেয়।
সচেতনতাই প্রধান প্রতিরোধ-
চিকিৎসকরা একমত যে সচেতনতার অভাবই ডেঙ্গুর সবচেয়ে বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। সঠিক সময়ে চিকিৎসকের কাছে গেলে ও টেস্ট করালে ডেঙ্গু সহজে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। কিন্তু উপসর্গকে অবহেলা করার ফলেই অনেক সময় রোগীর জীবন ঝুঁকিতে পড়ে।
ছোট্ট সাফরিনের মতো শিশু থেকে শুরু করে গ্রামীণ জনপদের সাধারণ মানুষ—সবাই আজ ডেঙ্গুর ভীতিকর ছোবলে আতঙ্কিত। পরিসংখ্যান ও হাসপাতালের চিত্র বলছে, এ রোগ শুধু শহরে সীমাবদ্ধ নেই, দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে গ্রামেও। তাই ব্যক্তিগত ও সামাজিক সচেতনতা ছাড়া ডেঙ্গু মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।

