ঢাকা জিপিওর পেছনের ফটক দিয়ে প্রবেশ করে বাঁ দিকে হেঁটে গেলে একটি শেডের নিচে মানুষের ব্যস্ততা চোখে পড়ে। অনেকে বিদেশে থাকা আত্মীয়-স্বজনকে পাঠাতে পোশাক, ওষুধসহ বিভিন্ন পণ্য নিয়ে এসেছেন। পণ্যগুলো চেক করে প্যাকেটজাত করছেন কয়েকজন ব্যক্তি। পাশেই কম্পিউটার নিয়ে বসে থাকা দুই ব্যক্তি অনলাইনে নাম, ঠিকানা ও অন্যান্য তথ্য পূরণ করছেন।
এরপর নির্দিষ্ট দপ্তরে গিয়ে অর্থ পরিশোধ করলে পণ্যটি বুকিং হয়। তখন একটি ট্র্যাকিং নম্বর দেওয়া হয়। এই নম্বর ব্যবহার করে গ্রাহক মুঠোফোনে কুরিয়ারটির সর্বশেষ অবস্থান জানতে পারেন। প্রতিদিন ঢাকা ও ঢাকার বাইরে শত শত মানুষ ডাক বিভাগের এই সেবা নিচ্ছেন। সেবাটির নাম আন্তর্জাতিক এয়ার পার্সেল। প্রবাসী বাংলাদেশিরাও একইভাবে দেশে থাকা স্বজনদের কাছে পণ্য পাঠাচ্ছেন। বিদেশি কুরিয়ারগুলোর তুলনায় খরচ কম এবং ঝামেলা কম হওয়ায় এটি জনপ্রিয় বলে ডাক অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
খরচ কতটা কম?
ঢাকা থেকে কানাডার মন্ট্রিলে ১ কেজি ওজনের পার্সেল পাঠাতে খরচ জানতে একটি আন্তর্জাতিক কুরিয়ার অফিসে যোগাযোগ করা হলে জানানো হয়, খরচ পড়বে ৭ হাজার ৬৩০ টাকা। পার্সেল পৌঁছাতে সময় লাগবে ৩–৪ কর্মদিবস।
অন্যদিকে একই পার্সেল ডাক বিভাগের ইএমএস সেবায় পাঠাতে খরচ হবে মাত্র ২ হাজার ৪০০ টাকা। প্যাকেজিং ও অনলাইনে তথ্য ইনপুট বাবদ খরচ ১৮০ টাকা। মোট খরচ দাঁড়াচ্ছে ২ হাজার ৫৮০ টাকা। দেখা যাচ্ছে, সরকারি সেবা নিলে বিদেশি কুরিয়ারের তুলনায় তিন ভাগের এক ভাগ খরচে পার্সেল পাঠানো সম্ভব। সময় বেশি লাগলেও সাধারণ পার্সেল ১৫–২০ দিনে পৌঁছায়। দ্রুত পাঠাতে চাইলে ডাক বিভাগের এক্সপ্রেস মেইল সার্ভিস বা ইএমএস নিতে হয়।
ডাক অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, জেলা ও উপজেলা ডাকঘর থেকে আন্তর্জাতিক এয়ার পার্সেল বা ইএমএসের মাধ্যমে ২০ কেজি পর্যন্ত পণ্য পাঠানো যায়। আন্তর্জাতিক এয়ার পার্সেল ১৮৩ দেশে, আর ইএমএস ৪৩ দেশে যায়। প্রবাসী বাংলাদেশিরা প্রধানত মধ্যপ্রাচ্য, যুক্তরাজ্য, আমেরিকা, কানাডা ও ইউরোপের দেশগুলোতে পার্সেল পাঠান। বছরের দুই ঈদ ও শীতের সময় পার্সেলের সংখ্যা বেশি থাকে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে প্রবাসী শ্রমিকরাও বেশি কুরিয়ার করেন।
জিপিওর সরেজমিন চিত্র:
সম্প্রতি জিপিওতে গিয়ে দেখা গেছে, বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ এয়ার পার্সেল ও ইএমএসে পণ্য পাঠাতে আসছেন। পণ্য যাচাই-বাছাই ও অনলাইনে ইনপুট দিতে কয়েকজন কর্মী ব্যস্ত সময় পার করছেন। তারা মূলত ডাক বিভাগের নিবন্ধন নিয়ে সেবা দিচ্ছেন। বিনিময়ে নির্ধারিত ফি আদায় করা হয়। তাদের বলা হয় লেটার রাইটার। লেটার রাইটার আনোয়ার হোসেন ২২ বছর ধরে এখানে কাজ করছেন। তিনি বলেন, দিনে ৬০০–৯০০ টাকা পর্যন্ত আয় হয়। রমজান মাসে কুরিয়ার বেশি হওয়ায় আয়ও বেড়ে যায়।
ডেপুটি পোস্টমাস্টার জেনারেল শাহনাজ সিদ্দিকী বলেন, আগে কিছু ত্রুটি থাকলেও এখন পুরো প্রক্রিয়া ডিজিটাল হয়েছে। বিদেশে যাওয়া সব পার্সেল স্ক্যান করে পাঠানো হয়। সন্দেহজনক প্যাকেজ থাকলে তা খুলে চেক করা হয়। একইভাবে বিদেশ থেকে আসা পার্সেলও পরীক্ষা করা হয়। পুরো প্রক্রিয়া সিসি ক্যামেরায় নজরদারি করা হয়। ফলে পণ্য হারানো বা নিষিদ্ধ পণ্য গ্রাহকের কাছে পৌঁছানোর সম্ভাবনা কম।
কোন দেশে খরচ কত:
আন্তর্জাতিক এয়ার কুরিয়ার পাঠানোর ডাক মাশুল ২০২২ সালে প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়। প্রথম ৫০০ গ্রাম বা আধা কেজি পাঠাতে কানাডায় খরচ ২ হাজার ৫০ টাকা, ব্রিটেনে ১ হাজার ৬৭০ টাকা, ইতালিতে ১ হাজার ৬১০ টাকা, জাপানে ১ হাজার ২২০ টাকা, কাতারে ১ হাজার ৫০ টাকা, সৌদি আরবে ১ হাজার ২৫০ টাকা, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১ হাজার ৩০ টাকা, আমেরিকায় ১ হাজার ৮৫০ টাকা। অতিরিক্ত প্রতি ৫০০ গ্রামের জন্য অল্প অতিরিক্ত খরচ নির্ধারিত। ইএমএসে প্রথম ১০০ গ্রামের জন্য নির্দিষ্ট মাশুল রয়েছে। অতিরিক্ত প্রতি ১০০ গ্রামের জন্যও খরচ আছে। ইএমএসে ১৫% শুল্ক ও কর দিতে হয়। এয়ার কুরিয়ারে আলাদা শুল্ক নেই।
ডাক অধিদপ্তরের কর্মকর্তা মোছা. রওনক ইসলাম জানান, সরকার এই সেবা থেকে মুনাফা করে না। তাই আন্তর্জাতিক এয়ার কুরিয়ার ও ইএমএসের খরচ বেসরকারি প্রতিষ্ঠান তুলনায় অনেক কম। তিনি বলেন, প্রতিটি ধাপে ডেটা স্ক্যান হওয়ায় গ্রাহক সহজেই কুরিয়ারের অবস্থান ট্র্যাক করতে পারেন। প্রাপকের কাছে সময়মতো পৌঁছানো না হলে অনুসন্ধানের মাধ্যমে কারণ জানা ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যায়।

