গত ৩৫ বছরে বাংলাদেশে লবণাক্ত জমির পরিমাণ প্রায় ২৬ শতাংশ বেড়েছে। বর্তমানে দেশের প্রায় ১০ লাখ ৫৬ হাজার হেক্টর জমি লবণাক্ততায় আক্রান্ত। এর মধ্যে উপকূলীয় অঞ্চলের মোট আবাদি জমির প্রায় ৩০ শতাংশ লবণাক্ততার প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। একই সময়ে দেশের ৪১ থেকে ৫০ শতাংশ এলাকা কোনো না কোনো সময় খরার কবলে পড়ে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এই সংকট আরও বাড়ছে। প্রভাব পড়ছে কৃষি উৎপাদনে। এই পরিস্থিতিতে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই সমাধান খুঁজতে সামুদ্রিক শৈবালভিত্তিক বায়োস্টিমুল্যান্ট নিয়ে গবেষণা শুরু করেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) একদল গবেষক।
বৃহস্পতিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অনুষদের ডিন অফিসের সম্মেলন কক্ষে একটি কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। ‘জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অজৈব চাপ মোকাবিলায় ফসলের সহনশীলতা বৃদ্ধিতে সামুদ্রিক শৈবালভিত্তিক বায়োস্টিমুল্যান্ট ব্যবহারের পরিবেশবান্ধব কৌশল’ শীর্ষক এই উদ্ভাবনী কর্মশালায় গবেষণার অগ্রগতি ও সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়।
‘হায়ার এডুকেশন ফর এগ্রিকালচারাল ট্রান্সফরমেশন’ (এইচইএটি) প্রকল্পের আওতায় কর্মশালাটি যৌথভাবে আয়োজন করে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) এবং বাকৃবির প্রাণরসায়ন ও অণুপ্রাণবিজ্ঞান বিভাগ।
কর্মশালায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সাব-প্রজেক্ট ম্যানেজার এবং বাকৃবির বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. তাহজিব-উল-আরিফ। তিনি বলেন, বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে বিপুল পরিমাণ সামুদ্রিক শৈবাল পাওয়া যায়। এখনো এসব শৈবাল বাণিজ্যিক বা কৃষিভিত্তিক ব্যবহারে পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়নি। দেশে ইতোমধ্যে ৪৭ প্রজাতির সবুজ, ৫৯ প্রজাতির বাদামী এবং ৯৪ প্রজাতির লাল শৈবাল শনাক্ত হয়েছে। এসব শৈবালে থাকা ফেনোলিক যৌগ, পলিস্যাকারাইড ও খনিজ উপাদান উদ্ভিদের বৃদ্ধি বাড়াতে সহায়তা করে। লবণাক্ততা ও খরার মতো প্রতিকূল পরিবেশে ফসলের টিকে থাকার সক্ষমতাও উন্নত করে।
তিনি আরও জানান, গবেষণার অংশ হিসেবে হাইপনিয়া, গ্রাসিলারিয়া, সারগাসাম ও এন্টারোমর্ফা প্রজাতির শৈবাল থেকে নির্যাস তৈরি করা হচ্ছে। এই নির্যাস ধান ও গমে প্রয়োগ করে কার্যকারিতা পরীক্ষা চলছে। পাশাপাশি কম্পিউটেশনাল পদ্ধতিতে শৈবালের জৈব সক্রিয় উপাদানের কর্মপদ্ধতি বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
কর্মশালার প্রধান অতিথি বাকৃবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে ফজলুল হক ভূঁইয়া বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে কৃষি খাত বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে আছে। এসব সংকট মোকাবিলায় পরিবেশবান্ধব ও টেকসই প্রযুক্তি উদ্ভাবনের বিকল্প নেই। সামুদ্রিক শৈবালভিত্তিক বায়োস্টিমুল্যান্ট ব্যবহার করে ফসলের সহনশীলতা বাড়ানোর এই গবেষণা দেশের কৃষির টেকসই ভবিষ্যৎ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তিনি গবেষণার ফল দ্রুত মাঠপর্যায়ে প্রয়োগের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।
প্রাণরসায়ন ও অণুপ্রাণবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. শায়লা শারমিনের সভাপতিত্বে কর্মশালায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কৃষি অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন অধ্যাপক ড. মাসুম আহমাদ, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন শাখার পরিচালক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মোশাররফ উদ্দীন ভূঁঞা এবং বাকৃবি রিসার্চ সিস্টেমের (বাউরেস) পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. হাম্মাদুর রহমান। এছাড়া বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক, গবেষক ও শিক্ষার্থীরা কর্মশালায় অংশ নেন।

