দেশের উত্তর, উত্তর-পূর্ব ও উত্তর-মধ্যাঞ্চলে আবারও বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। টানা বর্ষণের পাশাপাশি ভারতের মেঘালয়, আসাম ও পশ্চিমবঙ্গের উজান থেকে নেমে আসা পানির কারণে আগামী ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে অন্তত ১২টি জেলায় স্বল্পমেয়াদি বন্যা দেখা দিতে পারে বলে সতর্ক করেছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র। একই সঙ্গে আবহাওয়া অধিদপ্তরও জানিয়েছে, আগামী কয়েক দিন বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
বুধবার (৫ আগস্ট) প্রকাশিত বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র এবং আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের নদীগুলোর বড় অংশই উজানের পানির ওপর নির্ভরশীল। তাই প্রতিবেশী দেশের পাহাড়ি এলাকায় ভারী বৃষ্টিপাত শুরু হলে তার প্রভাব অল্প সময়ের মধ্যেই বাংলাদেশের নদ-নদীতে পড়তে শুরু করে। এবারও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, তিস্তা, ধরলা, দুধকুমার, ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর পানি আগামী দুই থেকে তিন দিন পর্যন্ত বাড়তে পারে। এর মধ্যে কয়েকটি নদীর পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে, এমনকি কোথাও কোথাও বিপৎসীমা অতিক্রম করারও আশঙ্কা রয়েছে।
সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, শেরপুর ও ময়মনসিংহ জেলার নিম্নাঞ্চল। এসব এলাকার পাশাপাশি আশপাশের নিচু অঞ্চলগুলোতেও পানি প্রবেশের সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশেষ করে তিস্তা অববাহিকায় পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্র জানিয়েছে, উজানে ভারী বৃষ্টির কারণে তিস্তা নদীর পানি দ্রুত বাড়ছে। একই সঙ্গে ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানিও বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটের চরাঞ্চল এবং নদীতীরবর্তী এলাকার মানুষ নতুন করে শঙ্কায় পড়েছেন।
ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, আজ সন্ধ্যা ৬টায় লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার তিস্তা ব্যারাজের ডালিয়া পয়েন্টে পানির উচ্চতা ছিল ৫২ দশমিক ১৩ মিটার, যা বিপৎসীমা ৫২ দশমিক ১৫ মিটার থেকে ২ সেন্টিমিটার নিচে। তবে এর আগে সকাল ৬টা ও ৯টায় নদীর পানি বিপৎসীমার ১৩ সেন্টিমিটার ওপরে প্রবাহিত হয়েছিল। পরে ধীরে ধীরে পানি কিছুটা কমতে শুরু করে। পানির চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি জলকপাট খুলে রাখা হয়েছে।
উত্তরাঞ্চলের পাশাপাশি সিলেট বিভাগেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। ভারতের মেঘালয় ও আসামে অব্যাহত ভারী বৃষ্টির কারণে সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর পানি বাড়ছে। এতে সিলেট ও সুনামগঞ্জের নিম্নাঞ্চল, হাওর এলাকা, নদীতীরবর্তী বসতি এবং গ্রামীণ সড়কে নতুন করে পানি ঢোকার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে উত্তর-মধ্যাঞ্চলের সোমেশ্বরী, ভোগাই, কংস ও পুরাতন ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার নদীগুলোর পানিও বাড়ছে। ফলে নেত্রকোনা, শেরপুর ও ময়মনসিংহ জেলার নিচু এলাকাগুলোতে স্বল্প সময়ের মধ্যে পানি প্রবেশ করতে পারে। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী এলাকায় পাহাড়ি ঢলের কারণে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বেশি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, বর্তমানে মৌসুমি বায়ু বাংলাদেশের ওপর সক্রিয় রয়েছে। এর প্রভাবে আগামী কয়েক দিন দেশের উত্তর, উত্তর-পূর্ব এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে। একই সময়ে ভারতের উজানেও ভারী বর্ষণের পূর্বাভাস রয়েছে। ফলে নদ-নদীর পানির উচ্চতা আরও বাড়তে পারে এবং কোথাও কোথাও বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
তবে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র বলছে, আপাতত এটি স্বল্পমেয়াদি বন্যার পূর্বাভাস। যদি বৃষ্টিপাত কমে আসে, তাহলে অধিকাংশ নদীর পানি ধীরে ধীরে নেমে যেতে পারে। কিন্তু ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকলে বন্যার সময়কাল দীর্ঘ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
পরিস্থিতি বিবেচনায় স্থানীয় প্রশাসনকে আগাম প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা-সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে নদীর পানি ও আবহাওয়ার পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে নদীতীরবর্তী ও নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার এবং প্রয়োজন দেখা দিলে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উজানের অতিবৃষ্টি ও আকস্মিক বন্যার প্রবণতা বাড়ছে। তাই শুধু তাৎক্ষণিক ত্রাণ কার্যক্রম নয়, দীর্ঘমেয়াদি নদী ব্যবস্থাপনা, আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষের জন্য কার্যকর প্রস্তুতি নিশ্চিত করাই ভবিষ্যতে ক্ষয়ক্ষতি কমানোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপায় হতে পারে।

