ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে ৫ হাজার শয্যায় উন্নীত করার দীর্ঘ প্রতীক্ষিত মেগা প্রকল্প বাতিল করা হয়েছে। সরকার পরিবর্তনের পর প্রকল্পটি আর এগোয়নি। বর্তমানে হাসপাতালটিকে ৪ হাজার শয্যায় উন্নীত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান জানান, মেগা প্রকল্পের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছিল। শুধু হাসপাতালের আশপাশের ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে মন্ত্রণালয়ের একটি চূড়ান্ত বৈঠক বাকি ছিল। তিনি বলেন, “সেই বৈঠক হওয়ার আগেই তৎকালীন সরকারের পতন ঘটে। এরপর প্রকল্পটি আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল করা হয়।”
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে ৫ হাজার শয্যায় উন্নীত করার একটি বড় প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছিল। হাসপাতালের নিজস্ব জমিতে ঐতিহ্যবাহী ভবন ও স্থান অক্ষুণ্ণ রেখে এই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ১০৮.৫ বিঘা জমিতে হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ, লাইব্রেরি, সেমিনার হল ও ডরমেটরির জন্য মোট ২৭টি ভবন নির্মাণের কথা ছিল। এর মধ্যে ছয়টি হাসপাতাল ভবন ১৭ তলা এবং অন্যান্য আবাসিক ও প্রশাসনিক ভবন ২০ তলা বিশিষ্ট হওয়ার কথা ছিল। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান আরও জানান, হাসপাতালে দুটি জরুরি বিভাগ ও দুটি আউটডোর সুবিধা অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা ছিল।
৪ হাজার শয্যা সমৃদ্ধ হাসপাতাল গঠনের পরিকল্পনা:
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল বর্তমানে ২ হাজার ৬০০ শয্যা বিশিষ্ট। কিন্তু প্রতিদিন রোগীর সংখ্যা প্রায় ৪ হাজার, কখনো কখনো ৪ হাজার ৫০০ ছাড়িয়ে যায়। অতিরিক্ত রোগীদের অনেককে হাসপাতালের মেঝে, বারান্দা ও সিঁড়ির পাশে চিকিৎসা নিতে হয়।
নিউরো ওয়ার্ডের বারান্দায় এক সপ্তাহ ধরে অপারেশনের অপেক্ষায় আছেন ৬৫ বছর বয়সী আইনুদ্দিন। ব্রেন টিউমারে আক্রান্ত এই সাবেক ফ্যামিলি প্ল্যানিং স্টোরকিপার ও তার পরিবার জানেন না, তার অপারেশন কখন হবে।
আইনুদ্দিন ও তার পরিবারকে ওয়ার্ডের বারান্দায় অন্যান্য রোগীর সঙ্গে মানবেতর অবস্থায় থাকতে হচ্ছে। তার মেয়ে রাবেয়া খাতুন বলেন, “পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে এক সপ্তাহ ধরে অপারেশনের তারিখের অপেক্ষায় আছি। বারান্দায় মশার কারণে কেউ ঠিকমতো ঘুমাতে পারছে না, সবচেয়ে বড় সমস্যা বাথরুম ব্যবহারের।” তিনি আরও বলেন, “আমরা গরিব মানুষ, প্রাইভেট হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার সামর্থ্য নেই, তাই এখানে থাকতে বাধ্য হচ্ছি।”
শুধু নিউরো বিভাগ নয়, হাসপাতালের প্রায় সব বিভাগেই রোগী ভর্তি থাকে ওয়ার্ডের মেঝে, বারান্দা এমনকি সিঁড়ির নিচেও। মানসম্মত ওয়ার্ড ও কেবিনের পাশাপাশি উন্নত ড্রেনেজ ব্যবস্থার ঘাটতিও রয়েছে।
৪ হাজার শয্যার নতুন প্রকল্প প্রস্তাব:
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল অতিরিক্ত রোগীর চাপ সামাল দিতে মেগা প্রকল্প বাতিলের পর নতুন করে ৪ হাজার বেডের একটি প্রকল্প প্রস্তাব করেছে।
হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান জানান, “স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত হলো—৫ হাজার নয়, ৪ হাজার বেডই বাস্তবসম্মত। কারণ ঢাকা মেডিকেল একটি একাডেমিক হাসপাতাল। শুধু বেড বাড়ালেই রোগীর চাপ কমবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।”
৪ হাজার শয্যার প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য মাস্টারপ্ল্যান তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে গণপূর্ত অধিদপ্তরকে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, গণপূর্ত অধিদপ্তর ও প্রধান প্রকৌশলীর সঙ্গে যৌথ বৈঠক হওয়ার কথা থাকলেও এখনো তারিখ নির্ধারিত হয়নি। মাস্টারপ্ল্যান চূড়ান্ত হতে কিছু সময় লাগায়, কর্তৃপক্ষ অন্তত একটি ভবনের কাজ দ্রুত শুরু করতে চায়। বিশেষ করে হাসপাতালের পুরোনো তিনতলা আউটডোর ভবনটি বর্তমানে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
পরিচালক বলেন, “আমরা আউটডোরের বিকল্প হিসেবে নতুন একটি ভবনের কাজ দ্রুত শুরু করতে চাই। প্রস্তাবিত ভবনটি ১৭ থেকে ২০ তলা বিশিষ্ট হবে এবং এতে ২ থেকে ৩টি বেসমেন্ট থাকবে। বার্ন ইউনিটের পেছনের অংশে ভবনটি নির্মাণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। আমরা আশা করছি চলতি অর্থবছরেই এ কাজ শুরু হবে।”
ধাপে ধাপে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা:
নতুন ভবনটি প্রথমে আউটডোর সেবার বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা হবে। ভবিষ্যতে মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী সেখানে প্রশাসনিক ভবন, ডে-কেয়ার সেন্টারসহ অন্যান্য সেবা যুক্ত করার সম্ভাবনা রয়েছে।
পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান বলেন, “আমাদের পরিকল্পনা হলো—একটি ভবন দিয়ে শুরু করে ধাপে ধাপে পুরো হাসপাতালের উন্নয়ন করা।” তিনি আরও বলেন, “বাস্তবে ঢাকা মেডিকেল এখন কেবল একটি একাডেমিক হাসপাতাল নয়, এটি দেশের সবচেয়ে বড় সার্ভিস হাসপাতাল।”
পরিচালক জানান, দেশের অনেক হাসপাতাল রোগী ফেরত দিলেও ঢাকা মেডিকেল কাউকে ফেরায় না। বর্তমানে হাসপাতালের প্রায় ৭৫ শতাংশ রোগী ইমারজেন্সির মাধ্যমে ভর্তি হয়। কিন্তু এই চাপ ভাগ করে নেওয়ার মতো কার্যকর ব্যবস্থা অন্যান্য হাসপাতালে নেই। তিনি আরো যোগ করেন, এই কারণে বিকেলেও সরকারি হাসপাতালগুলোতে সার্ভিস চালু রাখার বিষয়টি বিবেচনা করা প্রয়োজন।

