বইপ্রেমীদের প্রতীক্ষার অবসান। ‘বহুমাত্রিক বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্য নিয়ে আজ শুরু হচ্ছে অমর একুশে বইমেলা ২০২৬। বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) দুপুর ২টায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে বইমেলার উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
ভাষার মাসের আবেগ, সংস্কৃতি আর সৃজনশীলতার এক অনন্য মেলবন্ধন এই আয়োজন। যদিও রীতি অনুযায়ী মেলা শুরু হয় ফেব্রুয়ারির প্রথম দিনে, এবার ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও রমজান মাসের কারণে সময়সূচিতে পরিবর্তন এসেছে। ডিসেম্বরে আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত কয়েক দফা পিছিয়ে ২৬ ফেব্রুয়ারি থেকে মেলা শুরুর সিদ্ধান্ত হয়।
এবারের বইমেলায় অংশ নিচ্ছে মোট ৫৪৯টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে স্টল পেয়েছে ৮১টি প্রতিষ্ঠান এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে রয়েছে ৪৬৮টি প্রতিষ্ঠান। সব মিলিয়ে ইউনিট সংখ্যা ১ হাজার ১৮টি।
তুলনামূলকভাবে গত বছর অংশ নিয়েছিল ৭০৮টি প্রতিষ্ঠান এবং ইউনিট ছিল ১ হাজার ৮৪টি—অর্থাৎ সংখ্যায় কিছুটা কম হলেও এবারের আয়োজনকে আরও সুশৃঙ্খল ও পরিকল্পিতভাবে সাজানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন আয়োজকরা।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের উন্মুক্ত মঞ্চসংলগ্ন গাছতলায় থাকছে লিটল ম্যাগাজিন চত্বর। সেখানে ৮৭টি লিটল ম্যাগাজিন স্টল পেয়েছে। অন্যদিকে শিশুচত্বরে থাকছে ৬৩টি প্রতিষ্ঠান ও ১০৭টি ইউনিট—যেখানে ছোটদের জন্য থাকবে বই, আয়োজন আর আনন্দ।
মেলার সামগ্রিক বিন্যাস গতবারের মতোই রাখা হলেও মেট্রোরেল স্টেশনের অবস্থানের কারণে বাহিরপথ কিছুটা সরিয়ে মন্দির গেটের কাছে নেওয়া হয়েছে।
টিএসসি, দোয়েল চত্বর, এমআরটি বেসিং প্লান্ট ও ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউশন অংশে থাকবে চারটি প্রবেশ ও বাহিরপথ। খাবারের স্টলগুলো ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউশনের সীমানা ঘেঁষে সুবিন্যস্তভাবে সাজানো হয়েছে।
নামাজের স্থান, ওয়াশরুমসহ প্রয়োজনীয় অন্যান্য সেবা থাকবে আগের মতোই। পবিত্র রমজান উপলক্ষে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে তারাবি নামাজের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
বইমেলায় বাংলা একাডেমি ও অংশগ্রহণকারী অন্যান্য প্রতিষ্ঠান ২৫ শতাংশ কমিশনে বই বিক্রি করবে। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের নির্ধারিত কমিশনে বই বিক্রি করবে। বাংলা একাডেমির বই ও পত্রপত্রিকা কেনার জন্য মেলার দুই অংশেই আলাদা স্টল থাকবে।
মেলার প্রাণ কেবল বই নয়, আলোচনা ও সংস্কৃতিও। প্রতিদিন বিকেল ৩টা থেকে ৪টা পর্যন্ত মূল মঞ্চে থাকবে বিষয়ভিত্তিক সেমিনার। বিকেল ৪টা থেকে ৫টা পর্যন্ত চলবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
প্রতি শুক্র ও শনিবার বেলা ১১টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত থাকবে ‘শিশুপ্রহর’। শিশু-কিশোরদের জন্য চিত্রাঙ্কন, আবৃত্তি ও সংগীত প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে। নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচনের ব্যবস্থাও থাকবে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে।
মেলার প্রবেশ ও বাহিরপথে থাকবে পর্যাপ্ত আর্চওয়ে। সার্বিক নিরাপত্তায় দায়িত্ব পালন করবে পুলিশ, র্যাব, আনসার ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা। পুরো এলাকাজুড়ে বসানো হয়েছে প্রায় ৩০০টি ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা।
অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. সরওয়ার জানিয়েছেন, সাদা পোশাকের বিশেষ টিম মোতায়েন থাকবে। নারী ও শিশুদের জন্য নেওয়া হয়েছে আলাদা নিরাপত্তা ব্যবস্থা। যে কোনো জরুরি পরিস্থিতিতে সোয়াট টিম প্রস্তুত থাকবে।
ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করতে পারে—এমন কোনো বই স্টলে রয়েছে কি না, সেদিকেও নজরদারি থাকবে। পাশাপাশি কোনো ধরনের মব পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে তা কঠোরভাবে মোকাবিলা করা হবে বলে জানানো হয়েছে।
এবারের বইমেলাকে পরিবেশ সচেতন ও ‘জিরো ওয়েস্ট বইমেলা’ হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। স্টল, মঞ্চ, ব্যানার, লিফলেট ও খাবারের দোকানে পাট, কাপড়, কাগজের মতো পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণ ব্যবহারের আহ্বান জানানো হয়েছে।
মেলাপ্রাঙ্গণ ও আশপাশে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা, নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম, ধুলাবালি নিয়ন্ত্রণে পানি ছিটানো এবং মশক নিধনের ব্যবস্থাও থাকবে।
২৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত (ছুটির দিন ব্যতীত) প্রতিদিন বেলা ২টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত মেলা খোলা থাকবে। রাত ৮টা ৩০ মিনিটের পর নতুন করে কেউ প্রবেশ করতে পারবেন না। ছুটির দিনে মেলা চলবে বেলা ১১টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত।

