শিক্ষা ব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের কিছু অসঙ্গতি দূর করার পাশাপাশি নতুন সংস্কারের পথে এগোচ্ছে সরকার। এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের পে-স্কেলে অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে কাজ চলছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। একই সঙ্গে জাতীয় পর্যায়ের পরীক্ষা, শিক্ষার্থী ভর্তি প্রক্রিয়া এবং পাঠ্যক্রমে বেশ কয়েকটি পরিবর্তনের কথাও তুলে ধরা হয়েছে।
১৯ জুন সচিবালয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী জানান, আগামী ২ জুলাই থেকে শুরু হওয়া এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা দেশের সব শিক্ষা বোর্ডে একই প্রশ্নপত্রে অনুষ্ঠিত হবে। শুধু চলতি বছর নয়, আগামী বছরের এসএসসি পরীক্ষাও অভিন্ন প্রশ্নে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তাঁর মতে, একই দেশের শিক্ষার্থীদের জন্য বিভিন্ন বোর্ডে ভিন্ন ভিন্ন প্রশ্নপত্র থাকা সমতা ও মূল্যায়নের ক্ষেত্রে প্রশ্ন তৈরি করে। তাই পরীক্ষাব্যবস্থাকে আরও সুষম ও মানসম্মত করতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা অন্য কোনো অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি তৈরি হলেও পরীক্ষার কার্যক্রম নির্বিঘ্ন রাখতে প্রয়োজনীয় বিকল্প ব্যবস্থা প্রস্তুত রাখা হবে। ফলে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার সময়সূচি নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়তে হবে না।
সংবাদ সম্মেলনে মাধ্যমিক স্তরের ভর্তি পদ্ধতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের আভাস দেওয়া হয়। বর্তমানে চালু থাকা লটারিভিত্তিক ভর্তি ব্যবস্থা থেকে সরে এসে নতুন পদ্ধতি চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এতে শিক্ষার্থীর বসবাসের এলাকা এবং একটি সহজ মূল্যায়ন পদ্ধতির সমন্বয়ে ভর্তি কার্যক্রম পরিচালিত হবে। তবে কেন্দ্রীয়ভাবে বড় ধরনের প্রতিযোগিতামূলক ভর্তি পরীক্ষা নেওয়ার কোনো পরিকল্পনা নেই বলে স্পষ্ট করেন শিক্ষামন্ত্রী।
তিনি বলেন, অভিভাবকদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই। নতুন পদ্ধতির মূল্যায়ন এমন হবে না যে শিক্ষার্থীদের কোচিংয়ের ওপর নির্ভর করতে হবে। বরং এলাকার ভিত্তিতে সুযোগ নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের প্রাথমিক সক্ষমতা যাচাই করা হবে।
এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী স্বীকার করেন যে দীর্ঘদিন ধরে তাদের বিভিন্ন দাবি ও সমস্যা রয়েছে। সব সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান সম্ভব না হলেও পে-স্কেলের আওতায় আনার লক্ষ্যে কাজ এগিয়ে চলছে। শিক্ষা সংশ্লিষ্ট মহলে দীর্ঘদিন ধরে এ দাবি আলোচিত হয়ে আসছে। ফলে সরকারের এই অবস্থান শিক্ষকদের মধ্যে নতুন প্রত্যাশা তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষা নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, পরীক্ষাকালে প্রশ্নফাঁসের কোনো ঘটনা ঘটেনি। তিনি জানান, পরীক্ষার ফলাফল আগামী ২০ জুলাই প্রকাশ করা হবে।
শিক্ষাক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হিসেবে সেশনজট কমানোর কথা তুলে ধরেন তিনি। শিক্ষাবর্ষের সঙ্গে পরীক্ষার সময় আরও সমন্বিত করতে আগাম সময়সূচি প্রকাশ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ২০২৭ সালের এসএসসি পরীক্ষা ৭ জানুয়ারি এবং এইচএসসি পরীক্ষা ৬ জুন থেকে শুরু করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এতে শিক্ষার্থীরা আগে থেকেই প্রস্তুতির সুযোগ পাবে এবং শিক্ষাবর্ষের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সহজ হবে।
প্রাথমিক শিক্ষায় পরীক্ষার ফি চালুর বিষয়ে সম্প্রতি যে আলোচনা তৈরি হয়েছিল, সে প্রসঙ্গেও ব্যাখ্যা দেন শিক্ষামন্ত্রী। তিনি বলেন, বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক ও অবৈতনিক। তাই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পরীক্ষার জন্য কোনো ফি নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়নি।
সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা উপদেষ্টা মাহদী আমিনও ভবিষ্যৎ শিক্ষানীতির কিছু পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। তিনি জানান, আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে চতুর্থ শ্রেণিতে ‘ক্রীড়া’ ও ‘সংস্কৃতি’ নামে দুটি নতুন বিষয় যুক্ত করার চিন্তা করা হচ্ছে। পাশাপাশি ষষ্ঠ শ্রেণিতে ‘আনন্দময় শিক্ষা’ এবং ‘কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা’ বিষয় চালুর উদ্যোগ রয়েছে।
শিক্ষা উপদেষ্টার মতে, শুধু পরীক্ষার ফলাফল বা সনদ অর্জনের মধ্যে শিক্ষাকে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। শিক্ষার্থীদের নৈতিক মূল্যবোধ, সামাজিক দায়িত্ববোধ, সৃজনশীলতা, সংস্কৃতি চর্চা এবং কর্মমুখী দক্ষতা অর্জনের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। সেই লক্ষ্য নিয়েই নতুন পরিকল্পনাগুলো নেওয়া হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, অভিন্ন প্রশ্নপত্র, ভর্তি ব্যবস্থার পরিবর্তন, নতুন বিষয় সংযোজন এবং এমপিও শিক্ষকদের পে-স্কেলে অন্তর্ভুক্তির উদ্যোগ—সব মিলিয়ে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে নতুন কাঠামোয় নিয়ে যাওয়ার একটি প্রচেষ্টা দেখা যাচ্ছে। তবে এসব পরিকল্পনার বাস্তবায়ন কতটা কার্যকরভাবে করা যায়, সেটিই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।

