বাংলাদেশে অবৈধ সিগারেটের বিস্তার এখন উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। কঠোর আইন ও নজরদারির কথা থাকলেও বাস্তবে কার্যকর প্রয়োগের ঘাটতিতে প্রতিবছর প্রায় চার হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, অবৈধ সিগারেটের বাজার আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় দ্রুত বাড়ছে, যা অর্থনীতি ও জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে উঠেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী অবৈধ সিগারেট বাণিজ্যের কারণে বছরে প্রায় ৪০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ক্ষতি হয়, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় পাঁচ লাখ কোটি টাকার সমান। এই বৈশ্বিক সমস্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এখন বাংলাদেশও।
গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ইনসাইড মেট্রিক্সের তথ্য বলছে, বর্তমানে দেশের সিগারেট বাজারের প্রায় ১৩.১ শতাংশ অবৈধ পণ্যের দখলে। আগের বছরের তুলনায় এই হার ৩১ শতাংশ বেশি। প্রতি মাসে প্রায় ৮৩ কোটি ২০ লাখ শলাকা অবৈধ সিগারেট বাজারে প্রবেশ করছে। ফলে বছরে প্রায় চার হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার।
২০১৭-১৮ অর্থবছরে যেখানে অবৈধ সিগারেটের বাজার ছিল প্রায় ৬ শতাংশ, সেখানে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৫ শতাংশে—যা পরিস্থিতির দ্রুত অবনতিরই ইঙ্গিত দেয়।
বাংলাদেশে অবৈধ সিগারেটের বিস্তার মূলত তিনটি উৎসকে ঘিরে—
-
দেশীয় অবৈধ কারখানা
-
বিদেশি সিগারেট চোরাচালান
-
নকল ব্র্যান্ড উৎপাদন
সবচেয়ে বড় অংশটি আসছে দেশের অভ্যন্তরে গড়ে ওঠা অবৈধ কারখানা থেকে। বর্তমানে দেশে ৪১টির বেশি অবৈধ সিগারেট কারখানা সক্রিয় রয়েছে বলে জানা গেছে। পাবনা, কুষ্টিয়া, নাটোর, বগুড়া ও রংপুর অঞ্চল এসব উৎপাদনের প্রধান কেন্দ্র।
এসব কারখানায় নকল বা পুনর্ব্যবহৃত ট্যাক্স স্ট্যাম্প ব্যবহার করা হচ্ছে। ব্ল্যাক, পদ্মা, রকেট, পার্টনার, টপ টেনসহ ৬৭টির বেশি ব্র্যান্ডের অবৈধ সিগারেট উৎপাদিত হচ্ছে। এমনকি ২০২৫ সালেও নকল ও পুনরায় ব্যবহারযোগ্য স্ট্যাম্প ব্যবহার করে রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
দেশে প্রবেশ করা চোরাচালানি সিগারেটের প্রায় ৬৫ শতাংশ আসে সমুদ্রবন্দরনির্ভর সিন্ডিকেটের মাধ্যমে। চট্টগ্রামভিত্তিক এই চক্র কর্ণফুলী চ্যানেল, টেকনাফ, সমুদ্রবন্দর ও বিমানবন্দর ব্যবহার করে মন্ড, ব্ল্যাক, ইজি, প্যাট্রোনসহ বিভিন্ন বিদেশি ব্র্যান্ড দেশে ঢোকাচ্ছে।
এসব পণ্য পরে ঢাকা, সিলেট ও চট্টগ্রামের বাজারে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। বন্দরে স্ক্যানিং ব্যবস্থা ও কাস্টমস নজরদারি থাকা সত্ত্বেও এই প্রবাহ বন্ধ না হওয়ায় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
পরিচিত ব্র্যান্ডের নকল পণ্যও অবৈধ বাজারের বড় অংশ দখল করে নিয়েছে। বছরে প্রায় ৬০ কোটি শলাকা নকল সিগারেট বিক্রি হচ্ছে। কুষ্টিয়া, পাবনা, নাটোর ও বগুড়ায় অন্তত ১৩টি কারখানার বিরুদ্ধে সরাসরি নকল ব্র্যান্ড উৎপাদনের অভিযোগ থাকলেও শাস্তির উদাহরণ খুব কম।
এদিকে দেশে নকল ট্যাক্স স্ট্যাম্প ছাপানোর পাশাপাশি চীন থেকেও স্ট্যাম্প আমদানি হচ্ছে। ফলে সাধারণ ভোক্তার পক্ষে আসল ও নকল পণ্য চেনা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
অর্থনীতি বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে নিম্নস্তরের সিগারেটের দাম মুদ্রাস্ফীতির চেয়েও বেশি হারে বেড়েছে। বর্তমানে ৬০ টাকার এক প্যাকেট সিগারেটে ৮৩ শতাংশ শুল্কসহ প্রায় ৪৯.৪০ টাকা কর দিতে হয়। এই অতিরিক্ত করচাপ ফাঁকি দেওয়ার প্রবণতা বাড়াচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
উচ্চ কর ও মূল্যবৃদ্ধির কারণে নিম্ন আয়ের ভোক্তাদের একটি অংশ কম দামের অবৈধ সিগারেটের দিকে ঝুঁকছে। আন্তর্জাতিক উদাহরণও সতর্কবার্তা দিচ্ছে। মালয়েশিয়ায় ২০২৪ সাল পর্যন্ত অবৈধ সিগারেটের বাজার প্রায় ৫৫ শতাংশে পৌঁছেছে। পাকিস্তানে এই হার ৫৬ থেকে ৫৮ শতাংশ; সেখানে সরকার প্রতিবছর আনুমানিক ৪০০ বিলিয়ন রুপি বা প্রায় ১.৪ বিলিয়ন ডলার রাজস্ব হারাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, বাস্তবসম্মত করনীতি ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ না থাকলে বাংলাদেশেও একই চিত্র দেখা দিতে পারে।
অবৈধ তামাক বাণিজ্য দমনে স্পেশাল পাওয়ার অ্যাক্ট, পেনাল কোড, কাস্টমস অ্যাক্ট ও ট্রেডমার্ক অ্যাক্টে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে—সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন এমনকি মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত। কিন্তু মাঠপর্যায়ে এসব আইনের কার্যকর প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
অভিযান হয় বিচ্ছিন্নভাবে, কিন্তু সিন্ডিকেট অক্ষত থাকে—এমন অভিযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে কারখানা বন্ধ হলেও নতুন নামে আবার চালু হয়ে যায়।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, ৪১টির বেশি অবৈধ কারখানায় ব্যবহৃত প্রক্রিয়াজাত তামাক আসে মাত্র ছয় থেকে আটটি সরবরাহকারী কারখানা থেকে। এই সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর কঠোর নজরদারি আরোপ করা গেলে অবৈধ উৎপাদন অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
এনবিআরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ভ্যাট গোয়েন্দা ও শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগ নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে এবং বিপুল পরিমাণ সিগারেট জব্দও হচ্ছে। তবে শুধু এনবিআর একা এ সমস্যার সমাধান করতে পারবে না—সরকারের অন্যান্য সংস্থারও সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন।
সিপিডির জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী তামীম আহমেদের মতে, অবৈধ বা নকল সিগারেট কেবল রাজস্ব ক্ষতির বিষয় নয়; এটি স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ায়। পুরো সরবরাহ চেইন শনাক্ত করে বাজার তদারকি জোরদার করা এবং অর্থনীতিকে আরও ফরমাল কাঠামোর আওতায় আনা জরুরি।
অবৈধ সিগারেটের বিস্তার এখন শুধু কর ফাঁকির সমস্যা নয়—এটি অর্থনীতি, আইন-শৃঙ্খলা ও জনস্বাস্থ্যের জন্য সমানভাবে বিপজ্জনক। কার্যকর নজরদারি, কঠোর আইন প্রয়োগ, সরবরাহ চেইন নিয়ন্ত্রণ এবং জনসচেতনতা ছাড়া এই সংকট মোকাবিলা কঠিন।
আজ বছরে চার হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি—যদি এখনই ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, আগামী দিনে এই অঙ্ক আরও বড় হতে পারে।

