কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা আদালত থেকে জামিনে মুক্তি পাওয়ার অন্য মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর বিষয়ে বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছেন রাজশাহী রেঞ্জ পুলিশের ডিআইজি মোহাম্মদ শাহজাহান।
মঙ্গলবারের এই বিশেষ নির্দেশনা সংবলিত চিঠি পাঠানো হয়েছে রাজশাহী রেঞ্জের আওতায় থাকা রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, নাটোর, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া ও জয়পুরহাট এই আট জেলার পুলিশ সুপারদের কাছে।
পরবর্তী নির্দেশনা না আসা পর্যন্ত আদিষ্ট হয়ে নিম্নোক্ত বিষয়গুলোর প্রতি আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হচ্ছে উল্লেখ করে চিঠিতে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার করার কথা বলা হয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ বা স্থগিত ফ্যাসিস্ট সংগঠন বা সংগঠনসমূহের যে নেতৃবৃন্দ এবং কর্মী জামিনে মুক্তির পর দলকে শক্তিশালী, সংগঠিতকরণ এবং মাঠপর্যায়ে তৎপরতা প্রদর্শন করতে সক্ষম, তাদের জামিন হওয়ার পর অন্য মামলায় গ্রেপ্তার দেখাতে (শ্যোন অ্যারেস্ট) হবে।
আর যারা ওই বৈশিষ্ট্যের অধিকারী নয়, তাদের জামিন হলে গ্রেপ্তার (শ্যোন অ্যারেস্ট) দেখানোর প্রয়োজন আপাতত নেই বলে ডিআইজি মোহাম্মদ শাহজাহানের পাঠানো নির্দেশনায় বলা হয়েছে।
তবে, এই চিঠিতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ/স্থগিত ফ্যাসিস্ট সংগঠনের কথা বলা হলেও আওয়ামী লীগ বা তাদের কোনো সহযোগী সংগঠনের কথা সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি।

একইসঙ্গে প্রটোকল ও প্রটেকশন প্রদানের ক্ষেত্রে প্রচলিত আইন ও বিধি অনুসরণ করতে হবে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে চিঠিতে।
ডিআইজি শাহজাহানের এই চিঠিতে আরো বলা হয়েছে, ইতোপূর্বে এই বিষয়ে গ্রুপ মেসেজের মাধ্যমে পুলিশ সুপারদের অবহিত করা হয়েছে।
বিষয়টি অনুসরণীয় ও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে চিঠিতে।
চিঠির বিষয়ে জানতে চাইলে ডিআইজি মো. শাহজাহান বলেন, এই চিঠি সাংবাদিকদের কাছে যাওয়া চরম দুর্বলতা আমি মনে করি, আপনাদের কাছে যাওয়া উচিত ছিল না। এটা একান্তই অভ্যন্তরীণ বিষয়।
তিনি দাবি করেন, আওয়ামী লীগ বা তাদের সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের উদ্দেশ করে এই নির্দেশনা নয়। বরং সমাজে বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে পারে এমন ব্যক্তিদের জন্য এই বিশেষ নির্দেশনা। আইনশৃঙ্খলার অবনতি যেন না হয় সেজন্য নিজেদের সদস্যদের আগাম বার্তা দেওয়ার অংশ এই নির্দেশনা। এটি রুটিন ওয়ার্ক নয়।
আমরা কোনো ব্যক্তি, কোনো সংগঠন বা কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তি যারা সরকার কর্তৃক স্বীকৃত, তাদের কোনো ব্যক্তি বা সংগঠন টার্গেট করি নাই। যারা নিষিদ্ধঘোষিত, যারা সমাজের অপরাধী, বিভিন্ন কারণে নিষিদ্ধ সংগঠন, সমাজের ভেতরে বিশৃঙ্খলা করতে পারে, তাদের বিষয়ে কনসার্ন আমাদের।
পুলিশের সদর দপ্তর থেকে এ ধরনের নির্দেশনা দেওয়ার জন্য কোনো নির্দেশ এসেছে কি না এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, এটা সদর দপ্তরের না, এটা আমাদের একেবারেই ইন্টারনাল বিষয়। আমাদের সদস্যদেরকে অগ্রীম বার্তা দিয়ে রাখছি এটা।
চিঠির ভাষাগত কারণে ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে উল্লেখ করে এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, যেসব সংগঠন নিষিদ্ধ তাদের তৎপরতা যদি বেড়ে যায় তাহলে তাদের জন্য আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে পারে। এজন্য তাদেরকে আমরা বলছি আইনের আওতায় আনার জন্য। সিম্পল কথাটা আইনের আওতায় বললে এই শব্দগুলো আসতো না। সূত্র: বিবিসি বাংলা
আ. লীগ নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার দেখানো নিয়ে ডিআইজির নির্দেশনার যৌক্তিকতা—
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩১ এবং ৩২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, আইনানুযায়ী ব্যতীত কোনো ব্যক্তির জীবন, স্বাধীনতা বা দেহ থেকে তাকে বঞ্চিত করা যাবে না।
ডিআইজি’র নির্দেশনায় “জামিন পাওয়ার পর অন্য মামলায় গ্রেপ্তার (শ্যোন অ্যারেস্ট) দেখানো”র যে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, তা কার্যত বিচারবিভাগীয় প্রক্রিয়াকে পাশ কাটানোর একটি প্রশাসনিক কৌশল হিসেবে গণ্য হতে পারে। কিন্তু, বাংলাদেশের উচ্চ আদালত বিভিন্ন সময়ে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বা নতুন মামলা ছাড়া শুধুমাত্র রাজনৈতিক পরিচয় বা সাংগঠনিক সক্ষমতার ভিত্তিতে কাউকে কারারুদ্ধ রাখার প্রবণতাকে নিরুৎসাহিত করেছেন।
যদি কোনো ব্যক্তি জামিন পান, তবে তার অর্থ হলো আদালত তাকে মুক্ত রাখার যোগ্য মনে করেছেন। এমতাবস্থায়, শুধুমাত্র তিনি “দলকে শক্তিশালী করতে পারেন” এমন অনুমানের ভিত্তিতে নতুন মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো ব্যক্তিগত স্বাধীনতার পরিপন্থী এবং আইনের শাসনের (Rule of Law) লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
ডিআইজির এই নির্দেশনাটি প্রশাসনিক নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে সতর্কতামূলক মনে হলেও- সাংবিধানিক ও আইনি মানদণ্ডে এটি প্রশ্নবিদ্ধ এবং ক্ষমতার অপপ্রয়োগ হিসেবে গণ্য হওয়ার ঝুঁকি রাখে।

