দেশের বিদ্যুৎ খাতে বর্তমানে প্রায় ৭৬ হাজার কোটি টাকার সার্বিক ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কাছে পাওনা রয়েছে ৩৬ হাজার কোটি টাকা, আর বিভিন্ন সরকারি কোম্পানির পুঞ্জীভূত লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪০ হাজার কোটি টাকা। এই বিপুল আর্থিক চাপ সামাল দিতে এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ বজায় রাখতে বিদ্যুৎ বিভাগ অর্থ বিভাগের কাছে প্রয়োজনীয় অর্থ সহায়তা চেয়েছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু তাঁর দপ্তরে অর্থ উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। পরে মন্ত্রী ফোরাম ফর এনার্জি রিপোর্টার্স বাংলাদেশের (এফইআরবি) সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন এবং বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান বাস্তবতা তুলে ধরেন।
বৈঠকের বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বিদ্যুৎমন্ত্রী বলেন, দেশে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে সেখানে জ্বালানি সরবরাহের ব্যবস্থা নেই। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না। অথচ কেন্দ্রগুলো বসিয়ে রেখেও সরকারকে ক্যাপাসিটি পেমেন্ট দিতে হচ্ছে।
মন্ত্রী পরিস্থিতিকে “পুরোই হযবরল” বলে উল্লেখ করেন। তিনি জানান, খাতটির সার্বিক অবস্থা অর্থ বিভাগকে জানানো হয়েছে এবং প্রধানমন্ত্রীকেও বিস্তারিতভাবে অবহিত করা হবে। কারণ তাঁর ভাষায়, “এই খাতটি অত্যন্ত সংবেদনশীল। প্রধানমন্ত্রীর সব কিছু জানা থাকা উচিত।”
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিম জানান, নতুন দায়িত্ব নেওয়া অর্থ উপদেষ্টার সামনে বিদ্যুৎ খাতের সব দিক তুলে ধরা হয়েছে, যাতে তাঁরা পুরো চিত্রটি বুঝতে পারেন।
সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ইকবাল মাহমুদ বলেন, “আমরা লোডশেডিং রেখে গিয়েছিলাম সত্য; কিন্তু জাতির কাঁধে বোঝা রেখে যাইনি। এখন বাতি জ্বলে ঠিকই; কিন্তু জাতির কাঁধে বোঝা অনেক।”
তিনি মনে করেন, ঋণের ভারে ডুবে থাকার চেয়ে কষ্ট করে চলা ভালো। অর্থাৎ দৃশ্যত বিদ্যুৎ সরবরাহ ঠিক থাকলেও এর পেছনে যে বিপুল আর্থিক দায় তৈরি হয়েছে, সেটাই এখন বড় উদ্বেগের কারণ।
মন্ত্রী জানান, তাঁর আগের দায়িত্বকালীন সময়ে (বিএনপি সরকারের সময়) বিদ্যুৎ খাতে সিস্টেম লস ছিল ৬ শতাংশ। কিন্তু ১৯ বছর পরে এসে দেখা যাচ্ছে, তা বেড়ে ১০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। প্রাথমিকভাবে এটি ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রী মনে করেন, সিস্টেম লস কমাতে পারলে লোকসানও কমে আসবে এবং বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রয়োজন হবে না। পাশাপাশি বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সঙ্গে সমঝোতার পথ খোঁজা হচ্ছে, যাতে উভয় পক্ষের স্বার্থ রক্ষা করা যায়।
বিদ্যুৎ উৎপাদনে বেসরকারি অংশগ্রহণ নিয়ে প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, ২০০৪ সালে তাঁর সময় করা নীতিমালায় বলা ছিল—বিদ্যুৎ উৎপাদনে বেসরকারি অংশীদারিত্ব থাকবে ৩৫ শতাংশ এবং সরকারি থাকবে ৬৫ শতাংশ। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সেই নীতি অনুসরণ করা হয়নি।
বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বেসরকারি অংশীদারিত্ব বেড়ে ৮২ শতাংশে পৌঁছেছে। তাঁর মতে, এ কারণে সরকারের নিয়ন্ত্রণ কমে গেছে এবং বিপুল আর্থিক দায় তৈরি হয়েছে। “এত টাকার দায় ম্যানেজ করা কঠিন,” মন্তব্য করেন তিনি। তবে এই কঠিন পরিস্থিতিতেও সরকার বিদ্যুতের দাম বাড়াতে পারছে না বলেও জানান মন্ত্রী।
মন্ত্রী বলেন, সরকারের মূল লক্ষ্য এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যাতে রাষ্ট্র ঋণের ঝুঁকি থেকে মুক্ত থাকতে পারে এবং সাধারণ মানুষ সরাসরি উপকৃত হয়। তবে তিনি স্বীকার করেন, রাতারাতি সবকিছু ঠিক করা সম্ভব নয়। বিদ্যুৎ খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সময় লাগবে।
জ্বালানি খাত প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, সরকার বিদেশের ওপর নির্ভরশীল থাকতে চায় না। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে জোর দেওয়া হচ্ছে। নতুন রিগ কেনা হবে এবং সেখানে দক্ষ জনবল নিয়োগের পরিকল্পনাও রয়েছে।
তিনি বলেন, “কোয়ালিটি গ্যাস সরবরাহ আশা করা কঠিন, গ্যাস নেই আমি কী করব।” গরম যত বাড়বে, গ্যাসের চাপ তত কমবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
আবাসিক গ্রাহকদের কাছ থেকে পুরো বিল আদায়ের বিষয়ে প্রশ্ন উঠলে মন্ত্রী বলেন, মিটার থাকলে এই সমস্যা থাকত না। সরকার সবাইকে মিটার দেওয়ার পরিকল্পনা করছে, যাতে প্রকৃত ব্যবহার অনুযায়ী বিল নির্ধারণ করা যায়।
নিজের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ প্রসঙ্গে মন্ত্রী দাবি করেন, একাধিক তদন্ত বা কমিশন গঠন করা হলেও তাঁর বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাঁর ভাষায়, “উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আমার চরিত্র হনন করা হয়েছে।”
ভারতের আদানি গ্রুপ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আপাতত এ বিষয়ে কথা বলতে চান না। তবে অন্তর্বর্তী সরকার একটি প্রতিবেদন দিয়ে গেছে, যেখানে বিভিন্ন বিষয় উঠে এসেছে। সরকার সেগুলো পর্যালোচনা করছে।
মন্ত্রী জানান, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করে সংস্কার কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
সব মিলিয়ে স্পষ্ট—দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন অব্যাহত থাকলেও এর পেছনের আর্থিক কাঠামো এখন বড় চ্যালেঞ্জের মুখে। ৭৬ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি শুধু একটি সংখ্যা নয়; এটি ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বিদ্যুতের দাম এবং সাধারণ মানুষের জীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।
এখন দেখার বিষয়—সরকার কীভাবে এই জটিল সমীকরণ সামাল দেয় এবং বিদ্যুৎ খাতে কাঙ্ক্ষিত শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে পারে।

