রাজধানীর উত্তরায় একটি আবাসিক ভবনে গ্যাস পাইপলাইনের লিকেজ থেকে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এতে একই পরিবারের দুই শিশু ও এক অন্তঃসত্ত্বা নারীসহ মোট ১০ জন দগ্ধ হয়েছেন। বিস্ফোরণের পর আহতদের দ্রুত উদ্ধার করে রাজধানীর জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়েছে।
শুক্রবার (৬ মার্চ) ভোরের দিকে উত্তরার কামারপাড়া এলাকার ১০ নম্বর সেক্টরের একটি বহুতল ভবনে এই দুর্ঘটনা ঘটে। বিস্ফোরণের তীব্রতায় ভবনের একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ঘরের ভেতরে থাকা পরিবারের সদস্যরা গুরুতরভাবে দগ্ধ হন।
দগ্ধদের মধ্যে রয়েছেন—
রুবেল (৩০), তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী সোনিয়া আক্তার (২৫), তাদের তিন বছর বয়সী মেয়ে রোজা, সোনিয়ার বড় বোন রিয়া আক্তার (২৭), রুবেলের চাচাতো ভাই এনায়েত আলী (৩২), এনায়েতের স্ত্রী দেলেরা খাতুন (২৮), তাদের ছেলে জুনায়েদ (১০), এনায়েতের ছোট ভাই হাবিব (৩০), ভাগনি আয়েশা আক্তার (১৯) এবং আরেকজন রুবেল (৩৫)।
স্বজন ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কামারপাড়ার ১০ নম্বর সেক্টরের কবরস্থান রোডে মেম্বার বাড়ির পাশে আবুল কালামের মালিকানাধীন একটি ভবনের দ্বিতীয় তলায় বিস্ফোরণটি ঘটে। ওই বাসায় পরিবার নিয়ে বসবাস করতেন রাইড শেয়ারিং চালক রুবেল।
রুবেলের চাচাতো ভাই এনায়েত আলী দুবাই থেকে দেশে ফেরার পর পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বেড়াতে ঢাকায় আসেন। তাদের গ্রামের বাড়ি মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলায়। ঢাকায় এসে তারা রুবেলের বাসায় অবস্থান করছিলেন।
একই ভবনের চারতলায় বসবাসকারী সাজেদ মাতব্বর জানান, ভোরের দিকে হঠাৎ একটি বিকট শব্দে তিনি ঘুম থেকে জেগে ওঠেন। শব্দ শুনে নিচে নেমে এসে তিনি দেখেন নিচতলা ও দ্বিতীয় তলার দেয়ালের একটি অংশ ভেঙে পড়েছে এবং ঘরের ভেতরে থাকা লোকজন দগ্ধ অবস্থায় পড়ে আছেন।
তিনি বলেন, ‘ভোরে হঠাৎ একটি বিকট শব্দ শুনতে পাই। শব্দ এত জোরে ছিল যে মনে হয় ভবনের ভেতরে বড় ধরনের কিছু ঘটেছে। নিচে নেমে দেখি নিচতলা এবং দ্বিতীয় তলার দেয়াল ভেঙে গেছে। ঘরের ভেতরে থাকা ১০ জনই দগ্ধ হয়েছেন। আমরা দ্রুত তাদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করি।’
বিস্ফোরণের পরপরই আশপাশের বাসিন্দারা এগিয়ে এসে আহতদের উদ্ধার করেন। পরে তাদের দ্রুত রাজধানীর জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে নিয়ে যাওয়া হয়।
জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটের জরুরি বিভাগের আবাসিক সার্জন ডা. শাওন বিন রহমান দগ্ধদের শারীরিক অবস্থার বিষয়ে তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, অন্তঃসত্ত্বা সোনিয়া আক্তারের শরীরের শতভাগ অংশ দগ্ধ হয়েছে। এছাড়া এনায়েত আলীর শরীরের ৪৫ শতাংশ, রিয়া আক্তারের ৩২ শতাংশ, রুবেল (৩০)-এর ৩২ শতাংশ, শিশু রোজার ১৮ শতাংশ, জুনায়েদের ২৪ শতাংশ, দেলেরা খাতুনের ১৪ শতাংশ, রুবেল (৩৫)-এর ৭ শতাংশ, হাবিবের ১৯ শতাংশ এবং আয়েশা আক্তারের ১২ শতাংশ শরীর দগ্ধ হয়েছে।
ডা. শাওন বিন রহমান আরও জানান, যেসব রোগীর শরীরে দগ্ধের পরিমাণ বেশি তাদের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে স্থানান্তর করা হয়েছে। অন্যদের আপাতত পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে এবং প্রয়োজনে তাদেরও আইসিইউতে নেওয়া হতে পারে।
চিকিৎসকদের মতে, যেসব রোগীর শরীরে দগ্ধের পরিমাণ বেশি তাদের অবস্থা সাধারণত বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে থাকে। বিশেষ করে শতভাগ দগ্ধ হওয়া রোগীর চিকিৎসা অত্যন্ত জটিল হয়ে পড়ে।
ঘটনার খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরাও দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছান। ফায়ার সার্ভিসের নিয়ন্ত্রণ কক্ষের ডিউটি অফিসার রোজিনা আক্তার জানান, বিস্ফোরণের খবর পাওয়ার পরপরই দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়।
তিনি বলেন, ফায়ার সার্ভিসের ইউনিটগুলো পৌঁছানোর আগেই স্থানীয় বাসিন্দারা আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হন। ফলে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়েনি।
প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, গ্যাসের লাইনে লিকেজ বা গিজারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো ত্রুটি থেকে এই বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটতে পারে। তবে প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করতে তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ভোরের নীরবতার মধ্যে হঠাৎ বিস্ফোরণের শব্দে পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেকেই ঘর থেকে বেরিয়ে এসে ঘটনাস্থলের দিকে ছুটে যান।
এলাকাবাসী জানান, বিস্ফোরণের শব্দ এতটাই জোরালো ছিল যে আশপাশের অনেক বাড়ির মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। কেউ কেউ প্রথমে ভূমিকম্প বা বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে মনে করেছিলেন।
পরে ঘটনাস্থলে এসে তারা দেখতে পান ভবনের একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ভেতরে থাকা বাসিন্দারা দগ্ধ অবস্থায় পড়ে আছেন।
স্থানীয়দের সহযোগিতায় দ্রুত আহতদের উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে বলে জানান প্রত্যক্ষদর্শীরা। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার কারণে আহতদের চিকিৎসা শুরু করা সম্ভব হয়েছে।
এদিকে বিস্ফোরণের ঘটনায় এলাকায় উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা গ্যাস লাইনের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছেন।
তাদের মতে, গ্যাস লাইনের লিকেজ বা যন্ত্রপাতির ত্রুটি থেকে এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটলে তা বড় ধরনের প্রাণহানির কারণ হয়ে উঠতে পারে। তাই এ বিষয়ে নিয়মিত পরীক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানান, গ্যাস লিকেজ থেকে বিস্ফোরণের ঘটনা প্রতিরোধ করতে হলে বাসাবাড়িতে ব্যবহৃত গ্যাস লাইন ও গ্যাসচালিত যন্ত্রপাতি নিয়মিত পরীক্ষা করা জরুরি।
তারা বলেন, গ্যাসের গন্ধ পাওয়া গেলে দ্রুত জানালা খুলে দেওয়া এবং বিদ্যুৎচালিত কোনো সুইচ ব্যবহার না করার মতো সতর্কতা অনুসরণ করা উচিত।
ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ধারণে তদন্ত চলমান রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

