বাংলাদেশের শ্রমবাজার ও অভিবাসন খাত এমন এক মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা আর বিচ্ছিন্ন বলে মনে হচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফেরত পাঠানোর ঘটনার পর এবার ইতালি থেকেও বাংলাদেশিদের ফেরত পাঠানোর প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
আগামী ২০ এপ্রিল ৩০ বাংলাদেশিকে চার্টার্ড ফ্লাইটে ফেরত পাঠানোর কথা রয়েছে, এবং এ বিষয়ে ইতালি সরকার বাংলাদেশ সরকারকে ইতোমধ্যে চিঠিও দিয়েছে। ঘটনাটি শুধু ৩০ জন মানুষের দেশে ফিরে আসার খবর নয়; বরং এটি বড় এক বাস্তবতার ইঙ্গিত—বাংলাদেশিদের জন্য আন্তর্জাতিক অভিবাসনের পথ ক্রমশ বেশি নজরদারির, বেশি শর্তের, এবং অনেক ক্ষেত্রে বেশি ঝুঁকির হয়ে উঠছে।
একদিকে অবৈধ অভিবাসন, ভুয়া কাগজপত্র, মানবপাচার, অপরাধে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ; অন্যদিকে ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, কূটনৈতিক সতর্কতা এবং বিভিন্ন দেশে ভিসা নীতির কড়াকড়ি—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল। ব্যক্তিগত অনিয়ম যেমন আছে, তেমনি রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা। ফলে সমস্যা এখন শুধু ভিসা পাওয়া না-পাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; প্রশ্ন উঠছে বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীদের প্রতি বিভিন্ন দেশের আস্থার জায়গাটিও কতটা নড়বড়ে হয়ে যাচ্ছে।
এই পটভূমিতে ৮ এপ্রিল একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে। কানাডা, অস্ট্রেলিয়াসহ ইউরোপের ১৩টি দেশ বাংলাদেশি নাগরিকদের ভিসা প্রদানের ক্ষেত্রে একটি নির্দেশনা পাঠায়। একই সময় অস্ট্রেলিয়ার অভিবাসন নীতির পরিবর্তনও বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে আসে। দেশটির স্বরাষ্ট্র বিভাগ বাংলাদেশকে ‘প্রমাণের স্তর ৩’ বা সর্বোচ্চ ঝুঁকির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে। এর ফলে ভিসা পাওয়ার শর্ত আগের তুলনায় আরও কঠোর হয়েছে। অর্থাৎ সংকট এখন শুধু শ্রমবাজারে নয়; উচ্চশিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং ভবিষ্যৎ মানবসম্পদ রপ্তানির ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।
বিদেশ থেকে কাউকে ফেরত পাঠানো নতুন ঘটনা নয়। ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে এর আগেও অবৈধভাবে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের দেশে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর তাৎপর্য অন্য জায়গায়। আগে যে দেশগুলোকে বাংলাদেশি অভিবাসী বা শিক্ষার্থীরা তুলনামূলকভাবে উন্মুক্ত গন্তব্য হিসেবে দেখতেন, এখন সেসব দেশেও ঝুঁকি মূল্যায়ন বেড়েছে। ভিসা বন্ধ, ভিসা জটিলতা, বাড়তি যাচাই, নতুন শর্ত—সব মিলে বিদেশমুখী জনগোষ্ঠীর সামনে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ পরিস্থিতি যুক্ত হওয়ায় অভিবাসন ও কর্মসংস্থানের সামগ্রিক পরিবেশ আরও নাজুক হয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও সংকেতটা পরিষ্কার। দেশটির ভিসা নীতি পরিবর্তনের আওতায় ‘ভিসা বন্ড’ তালিকায় বাংলাদেশের নাম যুক্ত হয়েছে। গত বছরের মার্চ থেকে এক বছরে অন্তত ২৪৮ জন বাংলাদেশি যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফেরত এসেছেন। অভিযোগ আছে, যাদের পাঠানো হয়েছে তাদের অনেককে শিকল ও ডান্ডাবেড়ি পরিয়ে অমানবিকভাবে ফেরত পাঠানো হয়েছে। এই তথ্য শুধু কঠোর প্রশাসনিক অবস্থানই বোঝায় না; এটি আরও দেখায় যে অবৈধ প্রবেশ বা আশ্রয়প্রার্থনার ব্যর্থ প্রচেষ্টা এখন কেবল ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, তা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের ভাবমূর্তির সঙ্গেও জড়িয়ে যাচ্ছে।
ইতালির ঘটনাও সেই একই ধারার অংশ। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ২০ এপ্রিল চার্টার্ড ফ্লাইটে যাদের ফেরত পাঠানো হবে, তারা সেখানে অবৈধভাবে বসবাস করছিলেন। তাদের মার্চের তৃতীয় সপ্তাহে ফেরত পাঠানোর কথা থাকলেও যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে ফ্লাইটের সূচি বদলে যায়। অর্থাৎ সমস্যা শুধু আইনগত নয়, আন্তর্জাতিক সংঘাত ও আকাশপথের অনিশ্চয়তাও এখন প্রত্যাবাসন ও কর্মসংস্থানের বাস্তবতায় প্রভাব ফেলছে।
ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে ইতালির গুরুত্ব বাংলাদেশিদের জন্য অনেক বেশি। কারণ, এই দেশটিতেই ইউরোপে সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশি বসবাস করেন। ২০১৫ সালের অক্টোবরে কারিতাস-মিগ্রান্তেস ফাউন্ডেশনের এক পরিসংখ্যানে বলা হয়, দেশটির মোট কর্মশক্তির ১০ দশমিক ৫ শতাংশ বিদেশি নাগরিক। সেখানে প্রধান উৎসদেশ হিসেবে রোমানিয়া, মরক্কো, আলবেনিয়া, ইউক্রেন ও চীনকে চিহ্নিত করা হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পেরু ও বাংলাদেশ থেকে যাওয়া মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। আরও উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ইতালির অর্ধেকেরও বেশি প্রদেশে নতুন রেসিডেন্স পারমিট ইস্যুর ক্ষেত্রে বাংলাদেশিরা এখন শীর্ষ তিনটি দেশের মধ্যে রয়েছে।
এই পরিসংখ্যান দেখায়, ইতালিতে বাংলাদেশিদের উপস্থিতি কোনো প্রান্তিক বাস্তবতা নয়; বরং দৃশ্যমান এবং ক্রমবর্ধমান। তাই সেখান থেকে ফেরত পাঠানোর প্রতিটি ঘটনা আলাদা গুরুত্ব পায়। কারণ এর প্রভাব কেবল অবৈধভাবে থাকা ব্যক্তিদের ওপর পড়ে না; বৈধ পথে যেতে আগ্রহী মানুষ, ভবিষ্যৎ শ্রমবাজার, এমনকি পরিবারভিত্তিক অভিবাসন পরিকল্পনাও এর কারণে চাপে পড়ে।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফেরত আসা কয়েকজনের বক্তব্যে যে চিত্র উঠে এসেছে, তা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। তাদের অনেকে প্রথমে ব্রাজিল গেছেন, সেখান থেকে মেক্সিকো হয়ে অবৈধ পথে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেছেন। এই পুরো যাত্রায় জনপ্রতি খরচ হয়েছে প্রায় ৪৫ থেকে ৭০ লাখ টাকা। যুক্তরাষ্ট্রে ঢোকার পর অনেকে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করেন; কিন্তু দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে আবেদন বাতিল হলে তাদের প্রত্যাবাসনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এই অংশটি বাংলাদেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানে অভিবাসনের এক অন্ধকার অর্থনীতি কাজ করে। মানুষ জমি বিক্রি করে, ঋণ নেয়, পরিবারকে ঝুঁকিতে ফেলে, দালালচক্রের ওপর নির্ভর করে—তারপর বিদেশে গিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে। শেষ পর্যন্ত আশ্রয় না পেলে ফেরত আসতে হয় নিঃস্ব অবস্থায়। ফলে এটি শুধু আইন-শৃঙ্খলার প্রশ্ন নয়; এটি গ্রামীণ অর্থনীতি, পারিবারিক ঋণ, সামাজিক মর্যাদা এবং মানসিক স্বাস্থ্যের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।
সাম্প্রতিক প্রত্যাবাসনের সংখ্যাগুলোও বিষয়টির গুরুত্ব বাড়িয়ে দেয়। সর্বশেষ ২০ জানুয়ারি এক নারীসহ ৩৬ জনকে ফেরত পাঠানো হয়। এর আগে গত বছরের ৮ ডিসেম্বর ৩১, ২৮ নভেম্বর ৩৯, ৪ সেপ্টেম্বর এক নারীসহ ৩০, ২ আগস্ট ৩৯, ৪ জুন ৪২, এবং ৬ মার্চ থেকে ২১ এপ্রিল একাধিক দফায় ৩৪ জন ফেরত এসেছেন। এই ধারাবাহিকতা দেখায়, ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন নয়; বরং নিয়মিত বিরতিতে বাংলাদেশিরা ফেরত আসছেন।
ইউরোপের সঙ্গে বাংলাদেশের ২০১৭ সালে স্বাক্ষরিত স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউরস (এসওপি) চুক্তির ভিত্তিতে বৈধ কাগজপত্র ছাড়া যাওয়া ব্যক্তিদের ফেরত আনা হচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহযোগিতায় ব্র্যাক ফেরত আসা ব্যক্তিদের আর্থিক, মানসিক ও মানবিক সহায়তা দিয়ে থাকে। অর্থাৎ প্রত্যাবাসন এখন একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত প্রক্রিয়া—যা আরও দীর্ঘমেয়াদি হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
গত আট বছরে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রায় চার হাজার ব্যক্তি ফেরত এসেছেন। এদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সাইপ্রাস থেকে ৭৬৭ জন, ইতালি থেকে ৭৪৫, রোমানিয়া থেকে ৫১০, জার্মানি থেকে ৪২৪, ফ্রান্স থেকে ৪১৫, গ্রিস ৩৮০, মাল্টা ৩৩১, অস্ট্রিয়া ৮০, বুলগেরিয়া ৩৬, সুইডেন ৩৫, পর্তুগাল ২৮, ডেনমার্ক ১৯, স্পেন ১৯, পোল্যান্ড ১৬, বেলজিয়াম ৯, চেকপ্রজাতন্ত্র ৯, লাটভিয়া চার, ফিনল্যান্ড তিন, এস্তোনিয়া দুই, আয়ারল্যান্ড দুই, নেদারল্যান্ডস দুই, স্লোভেনিয়া দুই, এবং লিথুনিয়া থেকে দুজন। এই দীর্ঘ তালিকা একটি বিষয় স্পষ্ট করে—বাংলাদেশিদের অনিয়মিত অভিবাসন এখন ইউরোপের একাধিক দেশে ছড়িয়ে পড়া একটি বাস্তবতা।
এখানে একটি বড় নীতিগত প্রশ্নও উঠে আসে। যখন এত বিস্তৃত পরিসরে মানুষ ফেরত আসছেন, তখন কি শুধুই দালালবিরোধী অভিযান যথেষ্ট? নাকি অভ্যন্তরীণভাবে বৈধ অভিবাসন পরামর্শ, তথ্য যাচাই, দক্ষতা উন্নয়ন, ভাষা প্রশিক্ষণ এবং ভিসা-প্রসেসিং জবাবদিহি—সবকিছু একসঙ্গে শক্তিশালী করা দরকার? বাস্তবতা বলছে, দ্বিতীয় পথটিই বেশি প্রয়োজন।
বাংলাদেশের বৈদেশিক শ্রমবাজার মূলত মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর। বিএমইটি-র তথ্যমতে, ২০২৫ সালে ১১ লাখ ৩০ হাজারেরও বেশি কর্মী বিদেশে গেছেন। এর মধ্যে ৬৭ শতাংশ বা ৭ লাখ ৫৪ হাজার ৩৬৯ জন গেছেন সৌদি আরবে। দ্বিতীয় প্রধান গন্তব্য কাতার। এরপর রয়েছে সিঙ্গাপুর, কুয়েত, মালদ্বীপ, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও জর্ডান। এই পরিসংখ্যান পরিষ্কার করে, বাংলাদেশের শ্রম রপ্তানির ভিত্তি এখনো খুব সীমিত কয়েকটি গন্তব্যের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
কিন্তু সমস্যা হলো, সেই ভরসার জায়গাতেও অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে কাতার, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ অনেক উপসাগরীয় দেশ তাদের কিছু কার্যক্রমের গতি কমিয়ে দিয়েছে বা সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছে। ফলে অভিবাসী শ্রমিকরা অনিশ্চয়তায় পড়েছেন। এর প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে নিয়োগ, ভিসা, যোগদানের সময়, ফ্লাইট, চুক্তি নবায়ন—সবকিছুর ওপর পড়তে পারে।
এখানেই সবচেয়ে বড় উদ্বেগ। ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের দরজা কঠিন হচ্ছে, আর মধ্যপ্রাচ্যেও যদি ধীরগতি আসে, তবে বাংলাদেশের শ্রমবাজারে দ্বিমুখী চাপ তৈরি হবে। একদিকে নতুন কর্মী পাঠানো কঠিন হবে, অন্যদিকে যারা ফিরছেন তাদের পুনর্বাসনও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, জিসিসিভুক্ত ছয়টি দেশ—সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন ও ওমানে—বর্তমানে প্রায় ৪৫ লাখ বাংলাদেশি কর্মরত। আবার বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের মোট রেমিট্যান্সের প্রায় ৪৫ দশমিক ৪০ শতাংশ এসেছে এই ছয়টি দেশ থেকে। অর্থাৎ মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে ধাক্কা মানে শুধু চাকরির অনিশ্চয়তা নয়; দেশের বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহেও বড় প্রভাব পড়তে পারে।
বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, ভারত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, ইতালি, ভিয়েতনামসহ বিভিন্ন দেশের ভিসা সুবিধা কমেছে। অনেক দেশে ভিসা পেতে জটিলতা তৈরি হচ্ছে, আবার কোথাও কোথাও অন অ্যারাইভাল ভিসাও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এই বাস্তবতা শুধু পর্যটন বা শিক্ষাভিসার ক্ষেত্রেই সমস্যা তৈরি করছে না; এটি ব্যবসা, চিকিৎসা, কনফারেন্স, ট্রানজিট এবং কর্মসংস্থান—সব ধরনের আন্তর্জাতিক চলাচলকে প্রভাবিত করছে।
একটি দেশের নাগরিকদের জন্য যখন ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন রাষ্ট্র কঠোর অবস্থান নিতে শুরু করে, তখন তা সাধারণত তিনটি বার্তা দেয়। প্রথমত, ঝুঁকি মূল্যায়নে সেই দেশের নাম উপরের দিকে উঠে গেছে। দ্বিতীয়ত, অনিয়মিত অভিবাসন ও ভিসা অপব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। তৃতীয়ত, ভবিষ্যতে বৈধ আবেদনকারীরাও অতিরিক্ত যাচাইয়ের মুখে পড়বেন। বাংলাদেশের জন্য এ তিনটিই একসঙ্গে উদ্বেগজনক।
ফেরত আসা ব্যক্তিদের জন্য কিছু পুনরেকত্রীকরণ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান জানিয়েছেন, জোরপূর্বক বা স্বেচ্ছায়—যেভাবেই কেউ দেশে ফিরুন না কেন, বাংলাদেশে ফিরে তাদের পুনরেকত্রীকরণ সহায়তা দেওয়া হয়। বিমানবন্দরে জরুরি সহায়তা, কাউন্সেলিং এবং উদ্যোক্তা হিসেবে ব্যবসা দাঁড় করানোর জন্য আর্থিক সহায়তাও দেওয়া হয়। তিনি আরও বলেছেন, গত কয়েক বছরে ইউরোপ থেকে ফেরত আসা সবচেয়ে বেশি মানুষকে তারা সহায়তা করছেন; তারা এসেছেন সাইপ্রাস, ইতালি, রোমানিয়া, জার্মান, ফ্রান্স, গ্রিস ও মাল্টা থেকে।
এটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ, কিন্তু প্রশ্ন হলো—এটি কি যথেষ্ট? কারণ ফেরত আসা একজন মানুষ শুধু বিমানবন্দরে নেমে নতুন জীবন শুরু করেন না। তার পেছনে থাকে ঋণ, সামাজিক চাপ, ব্যর্থতার লজ্জা, পরিবারের প্রত্যাশা, এবং অনেক ক্ষেত্রে কর্মসংস্থানের শূন্যতা। ফলে পুনর্বাসনকে শুধু অনুদান বা কাউন্সেলিংয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না; প্রয়োজন স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থান সংযোগ, ক্ষুদ্রঋণ নয় বরং টেকসই অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, এবং মনোসামাজিক সহায়তার বিস্তৃত কাঠামো।
শরিফুল হাসান আরও সতর্ক করেছেন যে, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশি শ্রমিকরা অনিশ্চয়তায় আছেন। শত শত ফ্লাইট বিপর্যয়ের কারণে অনেকে সময়মতো কাজে যোগ দিতে পারেননি, আবার নতুনভাবে কাজের অনুমতি পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে আশঙ্কা রয়েছে, কেউ কেউ আবারও অবৈধভাবে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে যাওয়ার ঝুঁকি নিতে পারেন। এই সতর্কতাটি হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। কারণ বৈধ পথ সংকুচিত হলে অবৈধ পথের দালালরা ঠিকই সক্রিয় হয়ে ওঠে।
সব মিলিয়ে পরিস্থিতি যে কেবল একটি “ভিসা সমস্যা” নয়, তা এখন স্পষ্ট। এটি একযোগে শ্রমবাজার, শিক্ষাভিসা, কূটনীতি, মানবপাচার, সীমান্তনীতি, রেমিট্যান্স এবং রাষ্ট্রের ভাবমূর্তির প্রশ্ন। ২০ এপ্রিল ৩০ বাংলাদেশিকে ইতালি থেকে ফেরত পাঠানোর খবর সেই বৃহত্তর সংকটের সর্বশেষ দৃশ্যমান প্রকাশ মাত্র। এর আগে গত বছরের মার্চ থেকে এক বছরে অন্তত ২৪৮ জন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফেরত এসেছে; আবার গত আট বছরে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে ফিরেছেন প্রায় চার হাজার মানুষ। একই সময়ে ২০২৫ সালে ১১ লাখ ৩০ হাজারেরও বেশি কর্মী বিদেশে গেলেও দেশের শ্রমবাজারের মূল নির্ভরতা কয়েকটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের ওপর রয়ে গেছে।
বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ তিনটি। প্রথমত, বৈধ অভিবাসন প্রক্রিয়াকে আরও বিশ্বাসযোগ্য, সহজ এবং জবাবদিহিমূলক করা। দ্বিতীয়ত, দালালচক্র ও ভুয়া কাগজপত্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া। তৃতীয়ত, ফেরত আসা মানুষদের “ব্যর্থ অভিবাসী” হিসেবে না দেখে অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা। কারণ বাস্তবতা হলো, বিদেশে কাজ করতে যাওয়া মানুষদের পাঠানো রেমিট্যান্স শুধু অর্থনীতির সংখ্যা বাড়ায় না; তা হাজারো পরিবারের জীবনও টিকিয়ে রাখে।
এই সংকট তাই শুধু সীমান্তের গল্প নয়, এটি বাংলাদেশের সামাজিক-অর্থনৈতিক ভবিষ্যতেরও গল্প। এখন প্রশ্ন একটাই—দেশ কি এই সতর্কবার্তাকে সময় থাকতে গুরুত্ব দেবে, নাকি আরও বড় চাপের মুখে পড়ে পরে ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হবে?

