ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের কারণে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বাংলাদেশে জ্বালানি ও গ্যাস সংকটের আশঙ্কা তীব্র হয়ে উঠেছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার দেশজুড়ে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের রেশন ব্যবস্থা চালু করতে বাধ্য হয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেট থেকে বেশি দামে এলএনজি ও পরিশোধিত তেল আমদানির জন্য জোর চেষ্টা চালানো হচ্ছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জানিয়েছে, বর্তমানে দেশের জ্বালানি মজুত সীমিত। তাদের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান মজুত দিয়ে ডিজেল ১৪ দিন, পেট্রোল ১৫ দিন এবং অকটেন ২৮ দিন চলবে। এছাড়া ফার্নেস অয়েল দিয়ে ৯৩ দিন এবং জেট ফুয়েল দিয়ে প্রায় ৫৫ দিন চলা সম্ভব।
তবে বিপিসি কর্মকর্তারা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে বাজারে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে তার বড় কারণ প্যানিক বায়িং বা আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত জ্বালানি কেনা। ফলে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সরকার ইতোমধ্যে বেশ কিছু কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে।
রাজধানীর বিভিন্ন পেট্রোল পাম্প ও সিএনজি স্টেশনে গত কয়েক দিন ধরে গ্রাহকদের দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে। অনেকেই ভবিষ্যতে তেলের ঘাটতি হতে পারে এমন আশঙ্কায় আগেভাগেই নিজেদের গাড়ির ট্যাংক পূর্ণ করে রাখছেন।
বিপিসি চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান জানিয়েছেন, দেশে বর্তমানে প্রায় ১ লাখ ৩৬ হাজার মেট্রিক টন জ্বালানি তেলের মজুত রয়েছে। এছাড়া গত মঙ্গলবার পর্যন্ত ৭টি জাহাজের মাধ্যমে জ্বালানি আমদানির জন্য এলসি খোলা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, পেট্রোল ও অকটেন দেশের ভেতরেই উৎপাদিত হয়, তাই এগুলোর সংকট হওয়ার সম্ভাবনা কম। তবে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে আগামী মাসে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে পেট্রোল পাম্পে জ্বালানি সরবরাহ ১০ শতাংশ কমানো এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য গ্যাস সরবরাহ প্রতিদিন ৫০ মিলিয়ন ঘনফুট কমানো।
কৃষি খাতের প্রয়োজন বিবেচনায় সিলেটের শাহজালাল ফার্টিলাইজার কোম্পানি ছাড়া দেশের অন্য সব সার কারখানা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
মজুতদারি ও চোরাচালান ঠেকাতে মাঠে নামানো হয়েছে বিশেষ ভিজিল্যান্স টিম। পাম্প মালিকদের কঠোরভাবে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যেন খোলা ড্রাম বা কনটেইনারে কোনোভাবেই জ্বালানি বিক্রি না করা হয়।
একই সঙ্গে জরুরি ভিত্তিতে জ্বালানি আমদানির জন্য সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও চীনের সরবরাহকারীদের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকার দেশবাসীকে অপ্রয়োজনীয় যাতায়াত কমানো এবং ব্যক্তিগত গাড়ির বদলে গণপরিবহন ব্যবহারের আহ্বান জানিয়েছে।
উদাহরণ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজ দপ্তরে ৫০ শতাংশ বাতি বন্ধ রাখার পাশাপাশি এসির তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস নির্ধারণ করেছেন।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সরকারি-বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠানকে জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী নীতি গ্রহণ করতে হবে। বিশেষ করে গ্যাসের অপচয় রোধ এবং অবৈধ সংযোগ বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
সরকারের মতে, বৈশ্বিক এই সংকটের সময় সবাই যদি জ্বালানি সাশ্রয়ে সচেতন না হয়, তাহলে আগামী দিনগুলো আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

