রাহাদ সুমন, বরিশাল প্রতিবেদক—
তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের কাছে পাঁচটি প্রধান দাবি জানিয়েছে বৃহত্তর বরিশালবাসী। তাদের মতে, এই দাবিগুলো পূরণ হলে উন্নয়ন, সমৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে অনেকটাই এগিয়ে যাবে দক্ষিণের এই জনপদ। স্বাধীনতার পর গত ৫৫ বছর ধরে বহুবার এসব দাবির কথা বলা হলেও আজও সেগুলোর বাস্তবায়ন হয়নি।
ফলে সম্ভাবনার সবটুকু থাকা সত্ত্বেও ধান-নদী-খালের এই অঞ্চল অবহেলিতই থেকে গেছে। অথচ এখানে থাকা পর্যটনকেন্দ্র কুয়াকাটা, ভোলার প্রাকৃতিক গ্যাস এবং পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ঘিরেই পাল্টে যেতে পারে পুরো এলাকার অর্থনীতি।
চলমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় তাই নতুন সরকারের কাছে আবারো এসব দাবি তুলেছেন বরিশালের মানুষ। জাতীয় নির্বাচনে এই অঞ্চলের প্রায় সব আসন বিএনপিকে দেওয়ার বিনিময়ে দাবিগুলোর বাস্তবায়ন চাইছেন তারা।
সমস্যাগুলো সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে জানিয়ে বরিশাল-১ (গৌরনদী-আগৈলঝাড়া) আসনের সংসদ সদস্য ও তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, “দক্ষিণাঞ্চলের এই সমস্যাগুলো বহু আগে থেকেই অত্যন্ত সঠিকভাবে চিহ্নিত হয়ে আছে। আমরা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এসব সমস্যা সমাধানের কাজে হাত দেব। একনেকের উদ্যোগগুলো যাতে দ্রুত অন্তর্ভুক্ত হয় সেই কাজ এরই মধ্যে শুরু করে দিয়েছে বর্তমান সরকার। আশা করি শিগগিরই বরিশালের মানুষ সরকারের নেওয়া সেইসব উদ্যোগের বাস্তব চিত্র দেখতে পাবেন।”
ফরিদপুর-বরিশাল-কুয়াকাটা ছয় লেন মহাসড়ক: একসময় কুয়াকাটা থেকে বরিশাল হয়ে রাজধানী ঢাকায় যেতে উত্তাল পদ্মা পাড়ি দেওয়ার পাশাপাশি মোট ১৪টি ফেরি পার হতে হতো দক্ষিণাঞ্চলের মানুষকে। গত আওয়ামী লীগ সরকারের প্রায় ১৬ বছরে সেই অন্তহীন দুর্ভোগের চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে।
ফেরিগুলো আর নেই। পদ্মা নদীতেও নির্মিত হয়েছে স্বপ্নের পদ্মা সেতু। ফলে সড়কপথে রাজধানীর সঙ্গে যোগাযোগ অনেক সহজ হলেও এখনো বড় বাধা হয়ে আছে ফরিদপুরের ভাঙা থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত অপ্রশস্ত মহাসড়ক। পর্যটনকেন্দ্র কুয়াকাটা ও পায়রা বন্দরসহ দক্ষিণের ১০ জেলার সঙ্গে যোগাযোগের এই মহাসড়কটির প্রস্থ এখনো মাত্র ১৮ থেকে সর্বোচ্চ ৩৬ ফুট। অপ্রশস্ত এই সড়কে প্রতিদিন চলাচল করে কয়েক লাখ যানবাহন। সরু সড়কে চলতে গিয়ে প্রায় প্রতিদিনই ঘটে দুর্ঘটনা, আহত ও নিহত হন বহু মানুষ।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এই মহাসড়কটিকে ছয় লেনে উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ায় তা আর বাস্তবায়ন হয়নি।
বরিশাল বাস মালিক গ্রুপের সভাপতি জিয়াউদ্দিন সিকদার বলেন, “এই একটি মহাসড়ক আমাদের জন্য কত বড় দুঃখের কারণ তা বলে বোঝাতে পারব না। আগে ফেরি ছিল, যানবাহন চলত থেমে থেমে, জটিলতাও তেমন হতো না। এখন গাড়িগুলো একটানে ঢাকা থেকে গন্তব্যে পৌঁছাতে চায়। আমার দাবি, যত দ্রুত সম্ভব মহাসড়কটি ছয় লেনে উন্নীত করা হোক। তাহলে দ্রুত যাতায়াতের সুবাদে এই অঞ্চলে গড়ে উঠবে বহু শিল্পকারখানা এবং আসবে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি।”
কুয়াকাটা পর্যটনকেন্দ্রের উন্নয়ন: একই সৈকতে দাঁড়িয়ে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখার দুর্লভ সুযোগের কারণে দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছে পর্যটনকেন্দ্র কুয়াকাটা। রাজধানী থেকে মাত্র ২৮০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই সৈকতে খুব সহজেই পৌঁছানো যায়।
প্রতিদিন হাজার হাজার পর্যটক এখানে ভিড় জমালেও পর্যটনকেন্দ্রটির উন্নয়নে বিশেষ কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। মান্ধাতা আমলের বেড়িবাঁধ ও সেই বাঁধের ওপর স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের তৈরি সরু সড়ক ধরেই চলতে হয় পর্যটকদের। তার ওপর রয়েছে ভয়াবহ সাগরভাঙন।
এই সাগরভাঙন রোধ এবং সমুদ্রতীর ধরে মেরিন ড্রাইভ সড়ক নির্মাণসহ সাগরপাড়ের উন্নয়নে পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রায় ২৬ বছর আগে একটি প্রকল্প তৈরি করেছিল। নানা কারণ দেখিয়ে সেই প্রকল্পটি এখন পর্যন্ত চারবার পরিকল্পনা কমিশন থেকে ফেরত পাঠানো হয়েছে। সর্বশেষ গত বছরের মে মাসে জমা দেওয়া প্রস্তাবটিও এখনো আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে আছে। অথচ প্রকল্পটি অনুমোদন পেলে আমূল পাল্টে যেতে পারে কুয়াকাটার চিত্র এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে যোগ হতে পারে নতুন গতি।
কেবল সৈকত রক্ষা বা মেরিন ড্রাইভ নয়, অবকাঠামোগত দিক থেকেও অনুন্নত এই পর্যটনকেন্দ্র। পর্যটন এলাকার অভ্যন্তরীণ সড়ক যোগাযোগ থেকে শুরু করে অনেক কিছুই এলোমেলো অবস্থায় রয়েছে।
ট্যুরিজম অ্যাসোসিয়েশন অব কুয়াকাটা (টোয়াক)-এর প্রেসিডেন্ট রুম্মান ইমতিয়াজ তুষার বলেন, “এত সম্ভাবনাময় একটি পর্যটনকেন্দ্রকে এভাবে অবহেলায় ফেলে রাখা একমাত্র বাংলাদেশেই সম্ভব। এখানে একটি বিমানবন্দর স্থাপনসহ পর্যটনকেন্দ্রটিকে বিশ্বমানের করা হলে কেবল দেশি নয়, বিপুলসংখ্যক বিদেশি পর্যটকও এখানে আসতেন। এই একটি পর্যটনকেন্দ্রই দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতির গতি-প্রকৃতি বদলে দিতে পারে।”
ভোলা-বরিশাল সেতু: স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও দেশের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন রয়েছে দ্বীপজেলা ভোলা। চারদিকে নদী বেষ্টিত হওয়ায় জেলার নামের আগে ‘দ্বীপ’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়। এখনো সূর্য ডোবার পর থেকে পরদিন সূর্য ওঠা পর্যন্ত সড়ক কিংবা নৌ—সব পথেই অনেকটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এই জেলার মানুষ। দিনের বেলা যাতায়াতে নির্ভর করতে হয় লঞ্চ কিংবা স্পিডবোটের ওপর।
অথচ একটি সেতুই দূর করতে পারে এই বিচ্ছিন্নতার কষ্ট। বর্তমানে বরিশাল থেকে ভোলায় যেতে হলে উত্তাল কালাবদর ও তেঁতুলিয়া নদী পাড়ি দিতে হয় ফেরিতে। এই ফেরি পয়েন্টেই একটি সেতু নির্মাণের দাবি দীর্ঘদিনের।
আওয়ামী লীগ সরকার ভোলা-বরিশাল সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নিলেও তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।
ভোলা জেলা বিএনপির আহ্বায়ক গোলাম নবী আলমগীর বলেন, “আমাদের এখানে রয়েছে ভূগর্ভস্থ গ্যাসের বিশাল ভান্ডার। ফসল, মাছ এবং দইয়ের জন্যও বিখ্যাত এই জেলা। কিন্তু সড়ক যোগাযোগ না থাকায় এলাকা অবহেলিত হয়ে আছে। সরকারের কাছে আমাদের দাবি, এই সেতু নির্মাণ করে ভোলাকে সরাসরি সড়ক যোগাযোগের আওতায় আনা হোক।”
বিশেষায়িত আধুনিক হাসপাতাল: ব্রিটিশ আমলের জেলা বরিশালে এখনো নেই কোনো বিশেষায়িত আধুনিক হাসপাতাল। এখানে থাকা শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালটির অবস্থাও নাজুক। ছোটখাটো রোগের চিকিৎসা হলেও জটিল রোগের চিকিৎসা হয় না এখানে। ফলে বড় কোনো সমস্যা হলেই রোগীদের ছুটতে হয় রাজধানী ঢাকায়।
বরিশাল নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব ডা. মিজানুর রহমান বলেন, “একদিকে বিভাগীয় শহর, অন্যদিকে মেট্রোপলিটন সিটি—তবু এখানে হৃদরোগীদের উন্নত চিকিৎসা নেই। সামান্য এনজিওগ্রাম করাতেও যেতে হয় ঢাকায়। ক্যানসার, স্ট্রোক কিংবা মাথায় আঘাতজনিত রোগের চিকিৎসাও এখানে সম্ভব নয়। দক্ষ চিকিৎসক থাকলেও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি নেই। বরিশালে একটি আধুনিক বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণ করা হলে অন্তত জীবন বাঁচানোর আশা পাবে এই অঞ্চলের মানুষ।”
ঢাকা-বরিশাল-কুয়াকাটা রেললাইন: দেশের একমাত্র বিভাগ বরিশাল, যেখানে এখনো কোনো রেললাইন নেই। অথচ এখানে রয়েছে বিশ্বমানের পর্যটনকেন্দ্র কুয়াকাটা এবং পায়রা সমুদ্রবন্দর।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ফরিদপুরের ভাঙা থেকে বরিশাল হয়ে কুয়াকাটা পর্যন্ত রেললাইন স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে ক্ষমতা হারানোর কারণে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হয়নি। তখন সমীক্ষা করা হয়েছিল এবং জমি অধিগ্রহণের জন্য সীমানা চিহ্নও নির্ধারণ করা হয়েছিল।
বরিশাল হয়ে কুয়াকাটা পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণ হলে এই অঞ্চলের অর্থনীতি নতুন গতি পাবে। পায়রা সমুদ্রবন্দর থেকে রাজধানী পর্যন্ত আমদানি-রপ্তানি পণ্যের সহজ যোগাযোগ তৈরি হবে। পাশাপাশি পর্যটকেরাও সহজে ট্রেনে করে কুয়াকাটায় যেতে পারবেন।
বরিশাল চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের প্রেসিডেন্ট এবায়েদুল হক চান বলেন, “ব্রিটিশ আমলে একবার ঢাকা থেকে বরিশাল পর্যন্ত রেললাইন স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। রেলের অধিগ্রহণ করা সেই জমিগুলো এখনো রয়েছে। রেললাইন আমাদের জন্য কতটা জরুরি তা বলে বোঝানো যাবে না। আফসোস যে স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও এই দাবি করতে হচ্ছে। আশা করি বর্তমান সরকার এ বিষয়ে আন্তরিকভাবে উদ্যোগ নেবে।”

