বাংলাদেশের ব্যাংক খাত দীর্ঘদিন ধরেই খেলাপি ঋণের চাপে জর্জরিত। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এ সমস্যা কমার বদলে আরও গভীর হয়েছে, যা এখন একটি স্থায়ী কাঠামোগত সংকটে রূপ নিয়েছে। ঋণ বিতরণে অনিয়ম, দুর্বল যাচাই ব্যবস্থা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং ঋণ আদায়ে ধীরগতি—সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক ধরনের ‘দুষ্টচক্র’, যেখান থেকে ব্যাংক খাত সহজে বের হতে পারছে না।
বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে যেখানে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানো জরুরি, সেখানে ব্যাংকগুলোর বড় একটি অংশের মূলধন আটকে আছে অনাদায়ী ঋণের ভেতরে। ফলে নতুন ঋণ প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে, ব্যবসা সম্প্রসারণ থেমে যাচ্ছে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক গতি মন্থর হয়ে পড়ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এটি কেবল একটি আর্থিক সমস্যা নয়; বরং ব্যাংকিং খাতের কাঠামোগত দুর্বলতা ও দীর্ঘদিনের জবাবদিহিতার ঘাটতির প্রতিফলন। এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন আরও তীব্র হয়ে উঠছে—কেন বারবার চেষ্টা সত্ত্বেও ব্যাংক খাত এই খেলাপি ঋণের দুষ্টচক্র থেকে মুক্তি পাচ্ছে না?
২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছে প্রায় ৫ লাখ ৪৪ হাজার ৮৩১ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর মধ্যে শিল্প খাতে খেলাপি ঋণের হারও উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে প্রায় ৩১.২ শতাংশে পৌঁছেছে। এই পরিস্থিতি মূলত রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, দুর্বল সুশাসন এবং রাজনৈতিক প্রভাবের মাধ্যমে ঋণ অনুমোদনের প্রবণতার কারণে আরও তীব্র হয়েছে।
বর্তমান চিত্রে দেখা যাচ্ছে, কোটি টাকার বেশি ঋণসংবলিত অ্যাকাউন্টগুলোর মধ্যে খেলাপি ঋণের হার ৩১ শতাংশেরও বেশি, যা ব্যাংকিং ব্যবস্থার জন্য একটি সতর্ক সংকেত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। একই সঙ্গে শীর্ষ ২০ খেলাপি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বড় একটি অংশ দখল করে আছে কয়েকটি প্রভাবশালী শিল্পগোষ্ঠী, যার মধ্যে এস আলম গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলো বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাদের খেলাপি ঋণের পরিমাণই ২২ হাজার ৮৮১ কোটি টাকার বেশি, যা ব্যাংক খাতের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তুলছে।
সরকারি ব্যাংকগুলোর অবস্থাও উদ্বেগজনক। শীর্ষ খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের কাছে রাষ্ট্রায়ত্ত ৬টি ব্যাংকের প্রায় ৯১ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ আটকে আছে, যা এই ব্যাংকগুলোর আর্থিক সক্ষমতার ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করছে। এই খেলাপি ঋণ সংকটের মূল কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা রাজনৈতিক অরাজকতা, ঋণের অপব্যবহার এবং জামানতের ঘাটতিকে চিহ্নিত করেছেন। অনেক ক্ষেত্রে ঋণ বিতরণে স্বচ্ছতার অভাব এবং প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতাদের ক্ষেত্রে যথাযথ নজরদারি না থাকায় সমস্যা আরও গভীর হয়েছে।
এর প্রভাব এখন সরাসরি ব্যাংক খাতে পড়ছে। মূলধন সংকট, ঋণ প্রদানের সক্ষমতা হ্রাস এবং আন্তর্জাতিক লেনদেনের ব্যয় বৃদ্ধির মতো সমস্যা ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে, যা পুরো অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরি করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য ব্যাংক খাতে সুশাসন নিশ্চিত করা এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তভাবে ঋণ বিতরণ ও আদায় ব্যবস্থা গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি।
বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের দুষ্টচক্র দিন দিন আরও জটিল ও গভীর হয়ে উঠছে। এর অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে উঠে আসছে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, যার ফলে প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলো অনেক সময় পর্যাপ্ত জামানত বা কঠোর যাচাই-বাছাই ছাড়াই বিপুল অঙ্কের ঋণ সুবিধা পেয়ে থাকে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব ঋণের একটি বড় অংশ পরিশোধ না হয়ে খেলাপিতে পরিণত হয়েছে, যা এখন মোট ঋণের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ দখল করে আছে এবং এর বড় অংশই আদায়-অযোগ্য বা মন্দ ঋণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এই সংকট থেমে না থাকার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণগুলোর একটি হলো রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও জবাবদিহিতার ঘাটতি। অনেক ক্ষেত্রে বড় করপোরেট ঋণগ্রহীতারা ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলেও পুনঃতফসিল বা সুদ মওকুফের মতো সুবিধা পেয়ে যায়, ফলে ঋণ শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ে। একই সঙ্গে দুর্বল আইনি কাঠামো ও দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়ার কারণে ঋণ আদায়ের উদ্যোগগুলো কার্যকর ফল দিতে পারছে না, যার ফলে অনেক ঋণ শেষ পর্যন্ত মন্দ ঋণে পরিণত হচ্ছে।
এ ছাড়া ব্যাংকিং খাতে লুটপাট, বেনামী ঋণ এবং অর্থ পাচারের অভিযোগও পরিস্থিতিকে আরও ভঙ্গুর করে তুলেছে। এসব কারণে একদিকে যেমন ব্যাংকগুলোর সম্পদের মান কমে যাচ্ছে, অন্যদিকে তেমনি গ্রাহকদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হচ্ছে। এর প্রভাব হিসেবে অনেক ক্ষেত্রে আমানত উত্তোলনের চাপ বেড়ে গিয়ে ব্যাংকগুলো তারল্য সংকটের মুখে পড়ছে। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণের বিপরীতে পর্যাপ্ত প্রভিশন না রাখতে পারায় ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তিও দুর্বল হয়ে পড়ছে। সব মিলিয়ে এটি এখন কেবল একটি আর্থিক সমস্যা নয়, বরং একটি কাঠামোগত সংকট, যেখানে ক্ষমতাসীনদের ছত্রছায়ায় থাকা প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলোর পুনরাবৃত্ত সুবিধা পাওয়ার প্রবণতা ব্যাংক খাতকে বারবার একই চক্রে আটকে রাখছে।
বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের দুষ্টচক্র দীর্ঘদিন ধরে একটি স্থায়ী সংকটে রূপ নিয়েছে, যা এখন আর শুধু আর্থিক সমস্যা নয়, বরং গভীর প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার প্রতিফলন। এই সংকট থামছে না মূলত রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী মহলের চাপের কারণে। অনেক ক্ষেত্রে ঋণ অনুমোদনের সময় নিয়মনীতি উপেক্ষা করে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর চাপের কাছে নতি স্বীকার করা হয়, যার ফলে যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়াই বিপুল অঙ্কের ঋণ বিতরণ হয়ে যায়।
একই সঙ্গে দুর্বল আইনি কাঠামো এবং তার দুর্বল প্রয়োগ এই সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলেছে। খেলাপি ঋণের বিপরীতে পর্যাপ্ত জামানত না থাকা, দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়া এবং আইনি জটিলতার কারণে অনেক ঋণ আদায় করা সম্ভব হয় না, ফলে সেগুলো সহজেই মন্দ বা আদায়-অযোগ্য ঋণে পরিণত হচ্ছে। আরেকটি বড় সমস্যা হলো ঋণের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত না করা এবং পর্যবেক্ষণের ঘাটতি। অনেক ক্ষেত্রে ঋণ কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, তা কার্যকরভাবে মনিটর করা হয় না। পাশাপাশি প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণে একটি দায়মুক্তির সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, যা খেলাপি ঋণের প্রবণতা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
ব্যাংকিং খাতে জালিয়াতি, বেনামী ঋণ, ব্যাংক দখল এবং অর্থ পাচারের ঘটনাও এই সংকটকে আরও গভীর করেছে। এসব কারণে শুধু খেলাপি ঋণই বাড়ছে না, বরং ব্যাংক খাতের প্রতি মানুষের আস্থাও কমে যাচ্ছে, যা সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।
দীর্ঘ সময় ধরে কার্যকর সংস্কারের অভাবও এই সমস্যার অন্যতম মূল কারণ। ব্যাংকিং খাতের কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করার জন্য যে ধরনের ধারাবাহিক সংস্কার প্রয়োজন ছিল, তা না হওয়ায় সংকট আরও গভীর হয়েছে। এর ফলে ২০২৫ সালে খেলাপি ঋণ রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছে ব্যাংক খাতকে চরম চাপের মধ্যে ফেলেছে, যা থেকে উত্তরণের জন্য এখন কঠোর আইনি ব্যবস্থা এবং বাস্তবভিত্তিক নীতিগত সংস্কার অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকটের মূল কারণ শুধু আর্থিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা নয়, বরং এটি একটি কাঠামোগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যা। যতদিন পর্যন্ত ঋণ বিতরণে স্বচ্ছতা, কার্যকর নজরদারি এবং আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত না হবে, ততদিন এই দুষ্টচক্র ভাঙা সম্ভব নয়। একই সঙ্গে রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং জবাবদিহিমূলক ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি সমাধান অর্জন করা কঠিন হবে।
বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের এই দীর্ঘস্থায়ী সংকট এখন একটি কাঠামোগত সমস্যায় পরিণত হয়েছে, যেখানে রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল তদারকি, আইনি জটিলতা এবং জবাবদিহিতার অভাব একে অপরকে আরও জটিল করে তুলছে। এর ফলে ব্যাংকগুলোর আর্থিক স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ প্রবাহ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক গতি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এই দুষ্টচক্র থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন ঋণ বিতরণে স্বচ্ছতা, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যাংকিং ব্যবস্থা। কার্যকর সংস্কার ও বাস্তব প্রয়োগ ছাড়া এই সংকট থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়

