বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত আজ এক নীরব কিন্তু গভীর সংকটের মুখোমুখি। অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে যে খাতটি বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও উৎপাদনের ভিত্তি তৈরি করে, সেই খাতই এখন দুই দিক থেকে চাপে—অর্থ পাচার ও খেলাপি ঋণের বিস্তারে। একদিকে ব্যাংক থেকে নেওয়া বিপুল ঋণ বছরের পর বছর অনাদায়ী থেকে যাচ্ছে, অন্যদিকে দেশীয় সম্পদ নানা কৌশলে বিদেশে পাচার হয়ে অর্থনীতির ভেতর থেকে শক্তি শুষে নিচ্ছে।
এই দুই প্রবণতা শুধু আর্থিক অনিয়মের বিষয় নয়; এটি আস্থার সংকট, সুশাসনের ঘাটতি এবং নীতিগত দুর্বলতার একটি সম্মিলিত প্রতিফলন। ফলে ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা প্রশ্নের মুখে পড়ছে, যার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে সামগ্রিক অর্থনীতিতে। বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে এই সংকট আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে, যেখানে একটি দুর্বল ব্যাংকিং ব্যবস্থা পুরো উন্নয়ন অগ্রযাত্রাকেই বাধাগ্রস্ত করতে পারে। এ প্রেক্ষাপটে এই দ্বৈত চ্যালেঞ্জের গভীরতা, কারণ ও সমাধান নতুনভাবে ভাবা এখন সময়ের দাবি।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিস্থিতি এখন অত্যন্ত উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। এটি অর্থনীতির জন্য এক ধরনের “বিষফোড়া” হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা পুরো আর্থিক কাঠামোকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দিচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, খেলাপি ঋণ ক্রমাগত বাড়তে বাড়তে এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে মোট বিতরণকৃত ঋণের এক-তৃতীয়াংশের বেশি আদায় নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৮৪ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা। এরপর খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি ঘটে এবং ২০২৫ সালের মার্চ শেষে এটি প্রায় ৬ লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি পৌঁছে যায়, যা একটি রেকর্ড উচ্চতার ইঙ্গিত দেয়। একই বছরের সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ বেড়ে ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা অতিক্রম করে, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের প্রায় ৩৫.৭৩ শতাংশ। এই ধারাবাহিক বৃদ্ধি প্রমাণ করে যে খেলাপি ঋণ আর কোনো বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়; এটি এখন ব্যাংকিং খাতের গভীর কাঠামোগত সংকটে পরিণত হয়েছে।
এই বিপুল খেলাপি ঋণের একটি বড় অংশ সীমিত সংখ্যক বড় প্রতিষ্ঠানের হাতে কেন্দ্রীভূত। প্রায় ৫ হাজার ১১৩টি প্রতিষ্ঠানের কাছে আটকে আছে মোট খেলাপি ঋণের প্রায় ৬০ শতাংশ, যার পরিমাণ প্রায় ৩ লাখ ৩২ হাজার ৫০৪ কোটি টাকা। ফলে সমস্যাটি স্পষ্টভাবে প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত রূপ নিয়েছে।
ব্যাংকভেদে পরিস্থিতিও অত্যন্ত নাজুক। কিছু ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেমন ন্যাশনাল ব্যাংকের প্রায় ৭৫.৪৬ শতাংশ, এবি ব্যাংকের ৮৪.০৪ শতাংশ, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ৭০.১৭ শতাংশ এবং জনতা ব্যাংকের প্রায় ৭৩.১৮ শতাংশ। এতে স্পষ্ট হয় যে একাধিক ব্যাংক কার্যত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে খেলাপি ঋণ ছিল ৩ লাখ ৪৬ হাজার ৫৪৭ কোটি টাকা, যা মাত্র নয় মাসে বেড়ে ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। অনেক বিশ্লেষণে পুনঃতফসিলকৃত ও অবলোপনকৃত ঋণসহ প্রকৃত “ডিসট্রেসড অ্যাসেট” এর পরিমাণ ৬.৩ থেকে ৬.৪ ট্রিলিয়ন টাকারও বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই সংকটের পেছনে দীর্ঘদিনের তথ্য গোপন, ভুয়া প্রতিষ্ঠানকে ঋণ প্রদান, জালিয়াতি এবং সেই অর্থ বিদেশে পাচারের মতো ঘটনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। পাশাপাশি দুর্বল তদারকি, সুশাসনের অভাব এবং রাজনৈতিক প্রভাবে ঋণ বিতরণের সংস্কৃতি এই সংকটকে আরও গভীর করেছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে পরিস্থিতি আরও প্রকট, যেখানে মোট ঋণের প্রায় ৪৪ থেকে ৪৫ শতাংশ খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। শীর্ষ খেলাপিদের কাছ থেকে ঋণ আদায়ের হারও অত্যন্ত কম, যা আধা শতাংশের নিচে।
রাষ্ট্রমালিকানাধীন ছয় ব্যাংকের শীর্ষ ১২০ খেলাপির কাছে প্রায় ৯২ হাজার ৬২৭ কোটি টাকা পাওনা থাকলেও আদায় হয়েছে মাত্র ৪৬৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে জনতা ব্যাংকের ৫৮ হাজার ৬৪২ কোটি টাকার বিপরীতে আদায় মাত্র ৫৬ কোটি, সোনালী ব্যাংকের ৬ হাজার ৭৪৩ কোটি টাকার বিপরীতে ৯ কোটি এবং রূপালী ব্যাংকের ৮ হাজার ৭৭৪ কোটি টাকার বিপরীতে ৩৬১ কোটি টাকা আদায় হয়েছে। এই পরিস্থিতির ফলে ছয়টি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের মধ্যে চারটি মূলধন ঘাটতিতে পড়েছে, যা পুরো খাতের স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলেছে।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত বর্তমানে খেলাপি ঋণ ও অর্থ পাচারের দ্বৈত চ্যালেঞ্জে জর্জরিত। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, মোট ঋণের প্রায় ৩৬ শতাংশ খেলাপিতে পরিণত হয়েছে এবং সাড়ে ছয় লাখ কোটি টাকার বেশি ঋণ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এই সংকটের প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে দীর্ঘদিনের দুর্বল সুশাসন, রাজনৈতিক প্রভাব এবং অনিয়মিত ঋণ বিতরণ। অনেক ক্ষেত্রে যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়াই বড় অঙ্কের ঋণ অনুমোদন করা হয়েছে, যার বড় অংশ পরে আর ফেরত আসেনি। ভুয়া প্রতিষ্ঠান ও বেনামী কোম্পানির মাধ্যমে ঋণ নিয়ে সেই অর্থ বিদেশে পাচারের ঘটনাও ঘটেছে, যা ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে আরও দুর্বল করেছে।
অর্থ পাচারের ক্ষেত্রে হুন্ডি, ওভার-ইনভয়েসিং, আন্ডার-ইনভয়েসিং এবং ট্রেড-বেসড মানি লন্ডারিং ব্যবহৃত হচ্ছে। এর ফলে দেশের ভেতরে বিনিয়োগযোগ্য অর্থ বাইরে চলে যাচ্ছে এবং অর্থনীতির ভিত দুর্বল হয়ে পড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকির দুর্বলতা, বারবার ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ এবং ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া এই সংকটকে আরও গভীর করেছে। ফলে একটি “খেলাপি সংস্কৃতি” গড়ে উঠেছে, যেখানে ঋণ ফেরত না দেওয়াকে অনেক ক্ষেত্রে স্বাভাবিক হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই দ্বৈত সংকটের প্রভাব এখন পুরো অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়েছে। ব্যাংকগুলোতে তারল্য সংকট তৈরি হয়েছে, ফলে গ্রাহকদের আমানত ফেরত দেওয়া এবং নতুন ঋণ বিতরণ কঠিন হয়ে পড়ছে। একই সঙ্গে প্রভিশন সংরক্ষণের কারণে ব্যাংকগুলোর মূলধন কমে যাচ্ছে, যা তাদের আর্থিক ভিত্তিকে দুর্বল করছে এবং সাধারণ মানুষের আস্থা হ্রাস পাচ্ছে।
বিনিয়োগ ও উৎপাদন খাতেও স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। নতুন শিল্প স্থাপন ও ব্যবসা সম্প্রসারণ কমে যাওয়ায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ব্যাংকগুলো ঝুঁকি এড়াতে নিরাপদ বিনিয়োগে ঝুঁকছে, যা অর্থনীতির গতিশীলতা কমিয়ে দিচ্ছে। সামষ্টিক অর্থনীতিতে মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধি হ্রাস স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। অর্থ পাচারের কারণে রিজার্ভে চাপ তৈরি হচ্ছে এবং টাকার মান দুর্বল হচ্ছে। একই সঙ্গে কর রাজস্ব কমে যাচ্ছে, অর্থনৈতিক বৈষম্য বাড়ছে এবং ব্যবসার খরচ বৃদ্ধি পাচ্ছে, কারণ ব্যাংকগুলো লোকসান পুষিয়ে নিতে ঋণে বেশি সুদ আর আমানতে কম সুদ নির্ধারণ করছে। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য কাঠামোগত সংস্কার, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং কার্যকর তদারকি জরুরি। ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে এবং অর্থঋণ আদালতের কার্যকারিতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে ব্যাংক পরিচালকদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে যাতে অনিয়ম ও বেনামী ঋণ বন্ধ হয়।
খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনার জন্য আলাদা সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি গঠন করা যেতে পারে। অর্থ পাচার রোধে KYC প্রক্রিয়া শক্তিশালী করা, সন্দেহজনক লেনদেন পর্যবেক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানো জরুরি। বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা, দুর্বল ব্যাংক একীভূত করা এবং ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি ব্যবস্থা জোরদার করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে খেলাপি ঋণ ৮ শতাংশের নিচে নামানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, যা বাস্তবায়নের জন্য সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ ও অর্থ পাচারের এই দ্বৈত সংকট এখন আর শুধু আর্থিক সমস্যা নয়; এটি একটি জাতীয় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। এই সংকট ব্যাংকিং খাতের ভিত্তিকে দুর্বল করছে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করছে। তবে সুশাসন, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে এই সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। কার্যকর সংস্কারই পারে ব্যাংকিং খাতকে পুনরায় আস্থার ভিত্তিতে দাঁড় করাতে এবং অর্থনীতিকে স্থিতিশীল পথে ফিরিয়ে নিতে।

