সরকারের প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে বিপুল পরিমাণ ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে দেশের চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টদের শীর্ষ সংগঠন আইসিএবি। সংগঠনটির মতে, বাজেট ঘাটতি পূরণে ব্যাংকিং খাত থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নেওয়া হলে বেসরকারি খাতে অর্থপ্রবাহ কমে যেতে পারে, যা নতুন বিনিয়োগ, শিল্প সম্প্রসারণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
রাজধানীর সিএ ভবনে আয়োজিত ‘প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭: চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টদের ভাবনা’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে আইসিএবির নেতারা এ আশঙ্কার কথা তুলে ধরেন। তারা বলেন, অর্থনীতিকে গতিশীল রাখতে সরকারি ব্যয় ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি বেসরকারি খাতের সক্ষমতাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
আইসিএবি প্রেসিডেন্ট এন কে এ মবিন বলেন, আগামী অর্থবছরের বাজেটে প্রায় ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি ধরা হয়েছে। এর মধ্যে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ব্যাংকিং খাত থেকে সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। তাঁর মতে, সরকার যদি বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যাংক থেকে ধার নেয়, তাহলে ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণ সক্ষমতার বড় একটি অংশ সরকারি খাতে চলে যাবে। ফলে শিল্প ও ব্যবসা খাতের উদ্যোক্তারা প্রয়োজনীয় অর্থায়ন পেতে বাধার মুখে পড়তে পারেন।
অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, এমন পরিস্থিতিকে ‘ক্রাউডিং আউট ইফেক্ট’ বলা হয়। অর্থাৎ সরকার যখন বেশি ঋণ নেয়, তখন বেসরকারি খাতের জন্য ঋণের সুযোগ সংকুচিত হয়ে যায়। এর ফলে নতুন শিল্প স্থাপন, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান তৈরির গতি কমে যেতে পারে।
তবে আইসিএবি মনে করে, প্রস্তাবিত বাজেটে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, রাজস্ব আয় বৃদ্ধি, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, তা ইতিবাচক। কিন্তু এসব লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য কর প্রশাসনে দক্ষতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা এবং কাঠামোগত সংস্কার জরুরি।
সংস্থাটি বলছে, ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য অর্জন করতে হলে শুধু করের হার বাড়ানো নয়, কর ব্যবস্থার দক্ষতা ও স্বচ্ছতা বাড়াতে হবে। কর ফাঁকি কমানো, করদাতার সংখ্যা বৃদ্ধি এবং ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ ছাড়া এই উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য অর্জন কঠিন হতে পারে।
আইসিএবি নেতারা জানান, তাদের দেওয়া বেশ কয়েকটি প্রস্তাব এবারের অর্থবিলে স্থান পেয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ন্যূনতম কর ব্যবস্থা বাতিল, দীর্ঘমেয়াদে করহার নির্ধারণ, নিবন্ধিত স্টার্টআপের জন্য কর সুবিধা, কর ফেরত প্রক্রিয়া সহজ করা এবং কর আপিলের ক্ষেত্রে অর্থ জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা কমানো। এসব উদ্যোগ ব্যবসা পরিচালনার পরিবেশ উন্নত করতে সহায়ক হবে বলে মনে করছে সংগঠনটি।
বিশেষ করে প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোক্তা ও নতুন ব্যবসার জন্য কর প্রণোদনাকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। আইসিএবির মতে, স্টার্টআপ খাতের বিকাশ দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সংগঠনটি কনটেন্ট নির্মাতা ও ফ্রিল্যান্সারদের জন্য ভ্যাট অব্যাহতির সিদ্ধান্তকেও স্বাগত জানিয়েছে। একই সঙ্গে স্থানীয় উৎপাদনকে উৎসাহিত করতে ভ্যাট কাঠামোয় কিছু পরিবর্তন এবং কাস্টমস আইনে মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চলসংক্রান্ত বিধান যুক্ত করাকেও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে বাজেটের কয়েকটি প্রস্তাব নিয়ে উদ্বেগও প্রকাশ করেছে আইসিএবি। তাদের মতে, উৎপাদক, আমদানিকারক ও সরবরাহকারীদের মাধ্যমে খুচরা বিক্রেতাদের কাছে পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে ০.২ শতাংশ অগ্রিম কর আরোপ শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত করের বোঝা ভোক্তাদের ওপর চাপিয়ে দিলে বাজারে মূল্যস্ফীতি বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
এ ছাড়া ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন এবং মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট খোলার ক্ষেত্রে বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নম্বর বাধ্যতামূলক করার বিষয়েও সতর্ক করেছে সংস্থাটি। তাদের মতে, দেশের অসংখ্য ক্ষুদ্র ও উদীয়মান উদ্যোক্তা এখনও পুরোপুরি আনুষ্ঠানিক ব্যবসা কাঠামোর মধ্যে আসেননি। হঠাৎ করে কঠোর শর্ত আরোপ করলে তাদের ব্যবসা পরিচালনায় জটিলতা তৈরি হতে পারে।
আইসিএবি কর প্রশাসনের পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল রূপান্তরের ওপরও গুরুত্ব দিয়েছে। সংগঠনটির মতে, কর নির্ধারণ, আপিল, শুনানি এবং বিরোধ নিষ্পত্তির পুরো প্রক্রিয়া অনলাইনে নিয়ে এলে সময় ও ব্যয় উভয়ই কমবে। একই সঙ্গে করদাতাদের হয়রানি হ্রাস পাবে এবং রাজস্ব আদায়ে স্বচ্ছতা বাড়বে।
সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনা নিয়েও সুপারিশ করেছে সংগঠনটি। তাদের মতে, বাজেট বাস্তবায়নে কঠোর আর্থিক শৃঙ্খলা, নিয়মিত নিরীক্ষা এবং ব্যয়ের ওপর কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। রাজস্ব আয় বাড়ানোর পাশাপাশি অপচয় রোধ করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সংবাদ সম্মেলনে আইসিএবি নেতারা ডকুমেন্ট ভেরিফিকেশন সিস্টেম বা ডিভিএসের কার্যকারিতার কথাও তুলে ধরেন। তাদের মতে, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও আইসিএবির যৌথ উদ্যোগে চালু হওয়া এই ব্যবস্থা আর্থিক নথিপত্র যাচাইয়ে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি করছে এবং কর ফাঁকি রোধে সহায়ক ভূমিকা রাখছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দেশের অর্থনীতি বর্তমানে এমন এক পর্যায়ে রয়েছে যেখানে সরকারের উন্নয়ন ব্যয়, রাজস্ব সংগ্রহ এবং বেসরকারি বিনিয়োগের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা স্বল্পমেয়াদে বাজেট বাস্তবায়নে সহায়ক হলেও দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধির ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। ফলে রাজস্ব ভিত্তি সম্প্রসারণ, কর সংস্কার এবং ব্যয় দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে বাজেট ঘাটতি মোকাবিলার বিকল্প পথ খুঁজে বের করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।

