দেশের স্থবির হয়ে পড়া শিল্প খাতকে পুনরুজ্জীবিত করতে বড় আকারের আর্থিক উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানাগুলো পুনরায় চালু করে উৎপাদন বাড়ানো, কর্মসংস্থান রক্ষা এবং রপ্তানি সক্ষমতা জোরদার করতে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার একটি পুনঃঅর্থায়ন স্কিম চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এ বিষয়ে একটি নীতিগত প্রস্তাব প্রস্তুত করা হয়েছে, যা দ্রুত অনুমোদনের জন্য সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে পাঠানো হবে। অনুমোদন মিললে আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা জারি করে ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে এই তহবিল বিতরণ শুরু করা হবে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, বড় শিল্পখাতের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া কুটির, অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে ১০ হাজার কোটি টাকা এবং কৃষিখাতে আরও ১০ হাজার কোটি টাকা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এই অর্থ মূলত স্বল্পমেয়াদি চলতি মূলধন ঋণ হিসেবে দেওয়া হবে, যার মেয়াদ এক থেকে দেড় বছর হতে পারে। এতে কারখানা মালিকরা বন্ধ উৎপাদন ইউনিট পুনরায় সচল করতে পারবেন এবং দীর্ঘদিন অচল থাকা যন্ত্রপাতি ব্যবহার শুরু করতে পারবেন।
নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, যেসব প্রতিষ্ঠান আগে কার্যক্রম চালু রেখেছিল কিন্তু বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, মহামারির প্রভাব এবং বৈদেশিক মুদ্রা সংকটের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাদেরই এই সুবিধা দেওয়া হবে। বিশেষ করে যেসব প্রতিষ্ঠানের নিশ্চিত ক্রয়াদেশ রয়েছে এবং পণ্যের বাজার চাহিদা বিদ্যমান, তাদের অগ্রাধিকার দেওয়ার চিন্তা করা হচ্ছে।
তহবিলের অর্থায়ন পদ্ধতি নিয়ে এখনও আলোচনা চলছে। এটি সরাসরি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে দেওয়া হবে, নাকি সরকারের অন্য কোনো উৎস থেকে আসবে—তা চূড়ান্ত হয়নি। তবে ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকটের কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকেই অর্থায়নের সম্ভাবনা বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে বাজারে নতুন অর্থ প্রবাহ বাড়লে মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো স্বল্প সুদে এই তহবিল গ্রহণ করতে পারবে এবং গ্রাহক পর্যায়ে ঋণের সুদহার বর্তমান মূল্যস্ফীতির তুলনায় সামান্য বেশি হলেও নীতিসুদের নিচে রাখা হতে পারে। ফলে উদ্যোক্তারা তুলনামূলক সহজ শর্তে অর্থায়ন পেতে পারেন।
এদিকে ইতোমধ্যে দেশে বন্ধ বা আংশিক চালু থাকা এক হাজারের বেশি শিল্প ইউনিট শনাক্ত করা হয়েছে। বড় ও ছোট ঋণের ভিত্তিতে এগুলোকে আলাদা তালিকায় ভাগ করা হয়েছে। ব্যাংকগুলোর সঙ্গে বৈঠকের মাধ্যমে সম্ভাবনাময় কারখানা চিহ্নিত করার কাজও এগিয়েছে। যেসব প্রতিষ্ঠান ঋণখেলাপি হয়ে পড়েছে, তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ দিয়ে এরপর অর্থায়ন দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
সরকারের আগের কিছু সীমিত সহায়তা কর্মসূচির ধারাবাহিকতায় এই উদ্যোগ আসছে। অতীতে কিছু বড় শিল্পগোষ্ঠীর শ্রমিকদের বেতন পরিশোধ ও উৎপাদন আংশিক চালু রাখতে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছিল। একইভাবে রপ্তানি খাতে কর্মসংস্থান ধরে রাখতে নীতিগত সুবিধাও দেওয়া হয়।
অর্থনীতিবিদরা এই উদ্যোগকে সম্ভাবনাময় বলে মনে করলেও সতর্কতার ওপর জোর দিচ্ছেন। তাদের মতে, সব কারখানা পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব নয়। তাই টেকসই ব্যবসায়িক পরিকল্পনা আছে এমন প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাছাই করে সহায়তা দেওয়া উচিত। এতে কর্মসংস্থান বাড়ার পাশাপাশি কর ও ভ্যাট আদায়ের মাধ্যমে সরকারি রাজস্বও বাড়তে পারে।
তবে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরাসরি অর্থ সরবরাহ করলে বাজারে টাকার পরিমাণ বেড়ে গিয়ে মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে। তাই তহবিল গঠনে বিকল্প উৎস খোঁজা এবং ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আরও জানিয়েছেন, অতীতে প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার কঠোর নজরদারি রাখা হবে। অর্থের অপব্যবহার বা অনিয়ম ঠেকাতে যোগ্যতা যাচাই, ব্যবহার পর্যবেক্ষণ এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। সব মিলিয়ে এই পুনঃঅর্থায়ন স্কিম সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের শিল্প খাত নতুন গতি পেতে পারে। তবে এর প্রভাব কতটা ইতিবাচক হবে, তা নির্ভর করবে সঠিক পরিকল্পনা, তদারকি এবং অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার ওপর।

