দেশের অন্যতম বৃহৎ বেসরকারি ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি নতুন নেতৃত্বের অধীনে পরিচালিত হতে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খুরশীদ আলমকে ব্যাংকটির নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এমন এক সময় এই পরিবর্তন এলো, যখন ব্যাংকটির পরিচালনা, আর্থিক অবস্থা ও নীতিনির্ধারণ নিয়ে নানা আলোচনা ও বিতর্ক চলছিল।
রোববার বাংলাদেশ ব্যাংক আনুষ্ঠানিকভাবে প্রজ্ঞাপন জারি করে খুরশীদ আলমকে ইসলামী ব্যাংকের স্বতন্ত্র পরিচালক ও চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ থেকে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, ব্যাংক-কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর সংশ্লিষ্ট ধারার ক্ষমতাবলে এই নিয়োগ কার্যকর করা হয়েছে।
একই দিনে ব্যাংকের আগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক এম জুবায়দুর রহমান পদত্যাগ করেন। তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন। ফলে নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগের বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
ব্যাংক সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, গত কয়েক মাস ধরে ইসলামী ব্যাংকের ভেতরে নানা প্রশাসনিক ও নীতিগত টানাপোড়েন চলছিল। বিশেষ করে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মধ্যে কিছু বিষয়ে মতবিরোধ তৈরি হয়। এর মধ্যেই চেয়ারম্যান দীর্ঘ সময় বিদেশে অবস্থান করেন। পাশাপাশি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওমর ফারুক খানকেও ছুটিতে পাঠানো হয়েছিল। গত ১২ এপ্রিল অনুষ্ঠিত পরিচালনা পর্ষদের সভায় সেই ছুটি অনুমোদন দেওয়া হয়।
রোববার ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্ষদ সভা হওয়ার কথা ছিল। তবে সভাকে ঘিরে অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি হয়। ব্যাংকের কিছু গ্রাহক ও কর্মকর্তা সেখানে উপস্থিত হয়ে চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদত্যাগ দাবি করেন। পরে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠলে চেয়ারম্যান পদত্যাগপত্র জমা দেন বলে জানা যায়।
একই দিনে ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওমর ফারুক খানও পরিচালনা পর্ষদের কাছে নিজের পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে। যদিও ওইদিনের পর্ষদ সভা বাতিল হয়ে যাওয়ায় তার বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, ইসলামী ব্যাংকে সাম্প্রতিক এই পরিবর্তনের পেছনে মূল কারণ ব্যাংকটির আর্থিক অবস্থা নিয়ে বাড়তে থাকা উদ্বেগ। গত কয়েক বছরে ব্যাংকটির মুনাফা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালে ইসলামী ব্যাংকের মুনাফা ছিল প্রায় ৪৪৭ কোটি টাকা। কিন্তু ২০২৫ সালে তা নেমে আসে মাত্র ১৩৭ কোটি টাকায়।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো খেলাপি ঋণের পরিমাণ। কয়েক বছরের ব্যবধানে খেলাপি ঋণের হার ৪ দশমিক ২৫ শতাংশ থেকে বেড়ে প্রায় ৪৯ শতাংশে পৌঁছেছে। বর্তমানে ব্যাংকটির ৯২ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত রয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এ ধরনের পরিস্থিতি শুধু একটি ব্যাংকের জন্য নয়, পুরো ব্যাংকিং খাতের জন্যও বড় ধরনের ঝুঁকির ইঙ্গিত দেয়।
শুধু আর্থিক সূচক নয়, ব্যাংকটির মালিকানা কাঠামোতেও বড় পরিবর্তন এসেছে। আগে ইসলামী ব্যাংকে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশীদারত্ব ছিল প্রায় ৬৩ শতাংশ। কিন্তু ২০২৬ সালের মার্চ নাগাদ তা কমে দাঁড়ায় ১৭ দশমিক ৯১ শতাংশে। অন্যদিকে এস আলম গ্রুপ-সংশ্লিষ্ট প্রায় ৮২ শতাংশ শেয়ার বাংলাদেশ ব্যাংক জব্দ করেছে।
ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক মূলত ইসলামী ব্যাংকে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে। খুরশীদ আলম দীর্ঘদিন বাংলাদেশ ব্যাংকে দায়িত্ব পালন করায় তাকে অভিজ্ঞ ও প্রশাসনিকভাবে দক্ষ কর্মকর্তা হিসেবে দেখা হয়। ফলে ব্যাংকটির সংকট মোকাবিলা, সুশাসন নিশ্চিত করা এবং গ্রাহকদের আস্থা পুনরুদ্ধারে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করছেন, শুধু নেতৃত্ব পরিবর্তন করলেই পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি হবে না। খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, স্বচ্ছতা বৃদ্ধি, পরিচালনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনার মতো বিষয়গুলোতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
সব মিলিয়ে ইসলামী ব্যাংকে নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ দেশের ব্যাংকিং খাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এখন সবার নজর থাকবে নতুন নেতৃত্বের অধীনে ব্যাংকটি কত দ্রুত সংকট কাটিয়ে স্থিতিশীলতার পথে ফিরতে পারে তার ওপর।

