ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে রাজধানীজুড়ে এটিএম বুথগুলোতে নগদ অর্থ সংকট ও সেবাজটের কারণে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন গ্রাহকরা। কোথাও মেশিনে টাকা নেই, কোথাও কারিগরি সমস্যায় সেবা বন্ধ, আবার সচল বুথেও দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও অনেকেই টাকা তুলতে ব্যর্থ হচ্ছেন। শেষ কর্মদিবসে এমন পরিস্থিতি নগরজুড়ে আর্থিক লেনদেনে বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে।
ঈদের দীর্ঘ ছুটির আগে নগদ অর্থ উত্তোলনের চাপ স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যায়। কিন্তু এবার সেই চাপ সামলাতে গিয়ে ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সকাল থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় এটিএম বুথের সামনে গ্রাহকদের দীর্ঘ সারি দেখা যায়। তবে অধিকাংশ বুথেই দ্রুত নগদ অর্থ শেষ হয়ে যাওয়ায় অনেককেই খালি হাতে ফিরে যেতে হয়েছে।
অনেক গ্রাহক জানান, একাধিক বুথ ঘুরেও টাকা না পেয়ে তারা চরম হতাশায় পড়েছেন। কোথাও মেশিনে নগদ অর্থ না থাকায় সেবা বন্ধ ছিল, আবার কোথাও নেটওয়ার্ক ও যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে লেনদেন করা যায়নি। কিছু বুথে টাকা থাকলেও অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হয়েছে।
রাজধানীর রামপুরা এলাকায় একটি বুথে টাকা তুলতে গিয়ে একাধিকবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন এক বেসরকারি চাকরিজীবী। দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষার পর তিনি জানতে পারেন, বুথে আর কোনো নগদ অর্থ অবশিষ্ট নেই। একই অভিজ্ঞতা হয়েছে মতিঝিল এলাকার একাধিক গ্রাহকেরও।
মতিঝিলের বিভিন্ন ব্যাংক বুথ ঘুরে টাকা না পেয়ে অনেককে ব্যাংকের প্রধান শাখায় যেতে দেখা গেছে। সেখানে গিয়ে আবারও দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে টাকা তুলতে হয়েছে বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। এতে ঈদের কেনাকাটা ও যাতায়াত খরচ মেটাতে গিয়ে সাধারণ মানুষকে বাড়তি চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে।
শুধু এটিএম নয়, কিছু ব্যাংক শাখাতেও নগদ অর্থ সংকটের খবর পাওয়া গেছে। রাজধানীর মগবাজার এলাকায় একটি ব্যাংক শাখায় দীর্ঘ অপেক্ষার পর গ্রাহকদের জানানো হয়, আপাতত নগদ অর্থ সরবরাহ সম্ভব নয়। ফলে অনেকেই প্রয়োজনীয় টাকা না পেয়ে ফিরে যেতে বাধ্য হন।
ভুক্তভোগী এক গ্রাহক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এতক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার পর বলা হলো টাকা নেই। ঈদের আগে এমন পরিস্থিতি খুবই কষ্টকর। প্রয়োজনের সময় টাকা না পেলে পরিবার নিয়ে সমস্যায় পড়তে হয়।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ঈদ উপলক্ষে ব্যাংকগুলোকে প্রয়োজন অনুযায়ী পর্যাপ্ত নগদ অর্থ সরবরাহ করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দাবি, কোনো ব্যাংক নগদ অর্থ নিতে এসে খালি হাতে ফেরেনি। তবে তারা এটিও বলেছে, নিজ নিজ গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী নগদ অর্থ বিতরণে ব্যর্থ হলে সেটি সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনার বিষয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক আরও জানিয়েছে, ঈদের সময় এটিএম বুথ, অনলাইন পেমেন্ট ও মোবাইল আর্থিক সেবা নিরবচ্ছিন্ন রাখার নির্দেশনা আগে থেকেই দেওয়া হয়েছে। কোথাও গাফিলতি বা অব্যবস্থাপনা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বড় ছুটির আগে নগদ অর্থের চাপ একটি নিয়মিত ঘটনা হলেও এবার পরিস্থিতি তুলনামূলক বেশি তীব্র হয়েছে। তাদের মতে, পর্যাপ্ত পরিকল্পনা ও সঠিক নগদ সরবরাহ ব্যবস্থাপনা না থাকলে এমন সংকট প্রায় প্রতি বছরই পুনরাবৃত্তি হয়।
তারা আরও মনে করেন, শুধু নির্দেশনা জারি করাই যথেষ্ট নয়, বরং মাঠপর্যায়ে কঠোর নজরদারি এবং বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা জরুরি। না হলে গ্রাহক ভোগান্তি কমবে না।
এদিকে গ্রাহকদের অভিযোগ, প্রতিবছরই কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নির্দেশনা দেওয়া হলেও বাস্তবে বুথ পর্যায়ে তার প্রতিফলন দেখা যায় না। ফলে ঈদের মতো গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সাধারণ মানুষকে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
আগামী কয়েকদিন ব্যাংক বন্ধ থাকায় নগদ অর্থ সংকট আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অনেকে। ফলে ঈদের আগে শেষ সময়ে নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়ে ব্যাংক খাতের দুর্বলতা আবারও সামনে এসেছে।

