দেশের পাঁচটি সংকটাপন্ন শরিয়াভিত্তিক ব্যাংক একীভূত করে গঠিত ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ ঘিরে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। গ্রাহকদের আমানত ফেরত, ব্যাংকগুলোর আর্থিক পুনরুদ্ধার এবং একীভূতকরণ প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠছে বিভিন্ন মহলে। দীর্ঘদিন ধরে টাকা তুলতে না পেরে ক্ষুব্ধ গ্রাহকেরা আন্দোলনে নামলেও পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হয়নি।
ব্যাংক একীভূত করার মূল উদ্দেশ্য ছিল বড় ধরনের খেলাপি ঋণে বিপর্যস্ত পাঁচটি ইসলামী ধারার ব্যাংককে রক্ষা করা এবং আমানতকারীদের স্বার্থ নিশ্চিত করা। কিন্তু বাস্তবে পাঁচ মাস পার হলেও গ্রাহকদের আস্থা পুরোপুরি ফেরেনি। বরং প্রশাসনিক জটিলতা, সমন্বয় সংকট এবং নতুন আইনি বিতর্ক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদের মতো অনেক গ্রাহক অভিযোগ করছেন, তাদের কোটি কোটি টাকা দীর্ঘদিন ধরে আটকে আছে। তিনি দাবি করেন, তিনটি ভিন্ন ব্যাংকে তার তিন কোটির বেশি আমানত থাকলেও দীর্ঘ সময়েও খুব সামান্য অর্থ তুলতে পেরেছেন। বিভিন্ন দপ্তরে আবেদন, আন্দোলন ও কর্মসূচি করেও কোনো কার্যকর সমাধান পাননি বলে জানান তিনি।
সম্প্রতি চট্টগ্রাম, রাজশাহীসহ বিভিন্ন এলাকায় ক্ষুব্ধ গ্রাহকেরা বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছেন। কোথাও কোথাও ব্যাংকের শাখায় তালা ঝুলিয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। গ্রাহকদের অভিযোগ, প্রতিদিন নতুন অজুহাত দেখিয়ে তাদের অর্থ উত্তোলনে সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হচ্ছে।
গত বছরের ডিসেম্বরে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও এসআইবিএলকে একীভূত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ গঠন করা হয়। সে সময় ব্যাংকগুলোর মোট ঋণের পরিমাণ প্রায় দুই লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি ছিল। এর বড় অংশই খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছিল।
অর্থনীতিবিদদের মতে, শুরু থেকেই এই একীভূতকরণ প্রক্রিয়ায় কাঠামোগত দুর্বলতা ছিল। কারণ তুলনামূলক ভালো ও খারাপ ব্যাংক একত্র করার বদলে একাধিক দুর্বল ব্যাংককে একসঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। এতে আর্থিক ভারসাম্য তৈরি না হয়ে সংকট আরও ঘনীভূত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
ব্যাংকিং বিশ্লেষকদের ভাষ্য, পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের সাংগঠনিক সংস্কৃতি, ব্যবস্থাপনা কাঠামো ও কর্মপরিবেশ ভিন্ন হওয়ায় কার্যকর সমন্বয় গড়ে ওঠেনি। ফলে একীভূত ব্যাংক কাঙ্ক্ষিত গতিতে কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারছে না।
এদিকে নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে ‘ব্যাংক রেজল্যুশন আইন ২০২৬’। সংশ্লিষ্টদের একাংশের আশঙ্কা, আইনের কিছু ধারা ভবিষ্যতে বিতর্কিত সাবেক মালিকদের আবার ব্যাংকিং খাতে ফেরার সুযোগ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে নতুন আইনের একটি ধারা নিয়ে ব্যাংক মালিকদের সংগঠনও উদ্বেগ জানিয়েছে।
এই আইনের সুযোগ নিয়ে ইতোমধ্যে এসআইবিএল সম্মিলিত কাঠামো থেকে বেরিয়ে স্বতন্ত্র ব্যাংক হিসেবে পরিচালনার আগ্রহ দেখিয়েছে বলে জানা গেছে। ফলে পুরো একীভূতকরণ প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
তবে বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, এখনই এই উদ্যোগ ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা নেই। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পুরো প্রক্রিয়া চালু রয়েছে এবং ব্যাংকগুলোকে স্থিতিশীল করতে কাজ চলছে। যদিও এখন পর্যন্ত কোনো বড় দেশি বা বিদেশি বিনিয়োগকারী আগ্রহ না দেখানোয় পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া ধীরগতিতে এগোচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্রাহকদের আস্থা ফেরাতে হলে শুধু প্রশাসনিক পরিবর্তন যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন স্বচ্ছতা, দ্রুত সিদ্ধান্ত এবং খেলাপি ঋণ আদায়ে কঠোর পদক্ষেপ। একই সঙ্গে যারা অতীতে অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা কঠিন হবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ব্যাংক খাতের এই সংকট শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সমস্যা নয়, বরং পুরো আর্থিক ব্যবস্থার জন্য বড় সতর্ক সংকেত। তাই আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংককে আরও কার্যকর ও সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।

