দেশে ডিজিটাল লেনদেন বাড়াতে এবং নগদ অর্থের ব্যবহার কমাতে ক্রেডিট কার্ড খাতে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন নীতিমালায় কার্ডের ঋণসীমা দ্বিগুণ করার পাশাপাশি সুদের হার, ফি আদায় এবং গ্রাহক সুরক্ষায় কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই পরিবর্তনের ফলে মধ্যবিত্তসহ সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের প্রবণতা আরও বাড়বে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ নির্দেশনা অনুযায়ী, এখন থেকে কোনো জামানত ছাড়াই একজন গ্রাহক সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত ক্রেডিট সুবিধা পাবেন। আগে এই সীমা ছিল ১০ লাখ টাকা। একইভাবে জামানতের বিপরীতে ঋণের সীমা ২৫ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪০ লাখ টাকা করা হয়েছে।
ব্যাংক কর্মকর্তাদের মতে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও নগদ টাকার চাহিদা বৃদ্ধির কারণে গ্রাহকেরা আগের তুলনায় বেশি ক্রেডিট সুবিধা চাইছেন। নতুন নীতিমালা সেই চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। নতুন নিয়মে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হলো, কার্ডধারীরা এখন তাদের মোট ক্রেডিট সীমার সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত নগদ অর্থ উত্তোলন করতে পারবেন। জরুরি আর্থিক প্রয়োজনে এটি গ্রাহকদের জন্য বড় সহায়তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ক্রেডিট কার্ডের সুদ নিয়ে দীর্ঘদিনের অভিযোগের পর এবার সুদের ক্ষেত্রেও নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন নীতিমালায় বলা হয়েছে, ক্রেডিট কার্ডের সর্বোচ্চ বার্ষিক সুদহার ২৫ শতাংশের বেশি হতে পারবে না। পাশাপাশি সুদ শুধু অনাদায়ী বা বকেয়া অর্থের ওপর হিসাব করা যাবে, পুরো বিলের ওপর নয়।
ব্যাংকগুলোকে ফি ও চার্জ আদায়ের ক্ষেত্রেও স্বচ্ছতা বজায় রাখতে বলা হয়েছে। কার্ড সক্রিয় করার আগে কোনো ধরনের চার্জ নেওয়া যাবে না। বিল পরিশোধে দেরি হলে একাধিকবার জরিমানা আরোপের সুযোগও বন্ধ করা হয়েছে। এছাড়া সুদহার বা চার্জে পরিবর্তন আনলে অন্তত ৩০ দিন আগে গ্রাহককে জানাতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ২৬ লাখের বেশি ক্রেডিট কার্ড রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১৯ লাখ কার্ড সক্রিয়ভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি গ্রাহক মধ্যবিত্ত শ্রেণির হওয়ায় ব্যাংকগুলো এখন এই শ্রেণিকেই লক্ষ্য করে বিভিন্ন অফার ও সুবিধা দিচ্ছে।
ব্যাংকাররা বলছেন, অনলাইন কেনাকাটা, বিদেশি সেবার পেমেন্ট, বিমান টিকিট, রেস্টুরেন্ট বিল ও ডিজিটাল সাবস্ক্রিপশন বাড়ায় কার্ড ব্যবহারের পরিমাণও দ্রুত বাড়ছে। শুধু চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতেই দেশের ভেতরে কয়েক হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে। পরিসংখ্যানে আরও দেখা গেছে, নারী গ্রাহকের তুলনায় পুরুষ গ্রাহকের সংখ্যা অনেক বেশি। মোট কার্ডধারীর বড় অংশই পুরুষ, যদিও নারীদের অংশগ্রহণও ধীরে ধীরে বাড়ছে।
নতুন নীতিমালায় গ্রাহক হয়রানি বন্ধেও কড়া অবস্থান নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বকেয়া টাকা আদায়ের নামে গ্রাহককে হুমকি দেওয়া, পরিবারের সদস্যদের বিরক্ত করা বা মানসিক চাপ সৃষ্টি করাকে অনৈতিক ও শাস্তিযোগ্য আচরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। রিকভারি এজেন্টদের যোগাযোগও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে বলা হয়েছে।
এছাড়া কার্ড হারিয়ে গেলে দ্রুত ব্লক করার সুবিধা নিশ্চিত করতে ব্যাংকগুলোকে ২৪ ঘণ্টার হেল্পলাইন চালুর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কার্ড পাওয়ার যোগ্যতার ক্ষেত্রেও পরিবর্তন এসেছে। এখন ১৮ বছর বয়স হলেই ক্রেডিট কার্ডের জন্য আবেদন করা যাবে। পাশাপাশি ১৬ বছর বয়সী শিক্ষার্থীরা অভিভাবকের অধীনে সাপ্লিমেন্টারি কার্ড ব্যবহার করতে পারবে। তবে আবেদনকারীর ই-টিন এবং ভালো ঋণ ইতিহাস থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন নীতিমালা দেশের ডিজিটাল অর্থনীতিকে আরও এগিয়ে নিতে সহায়ক হবে। তবে একই সঙ্গে দায়িত্বশীল ব্যবহার, সময়মতো বিল পরিশোধ এবং ব্যাংকগুলোর কার্যকর তদারকি নিশ্চিত না হলে ঋণঝুঁকিও বাড়তে পারে।

