দেশের মোবাইল আর্থিক সেবা খাতে আবারও শক্ত অবস্থানের প্রমাণ দিল বিকাশ। ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে প্রতিষ্ঠানটির নিট মুনাফা ৪০ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮৪ কোটি টাকায়। ধারাবাহিকভাবে আয় বৃদ্ধি, গ্রাহক সম্পৃক্ততা এবং ডিজিটাল লেনদেনের বিস্তার—সব মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটি এখন দেশের আর্থিক প্রযুক্তি খাতের অন্যতম শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে।
বিকাশ-এর অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে তাদের মোট নিট আয় বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৮০২ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশ বেশি।
প্রতিষ্ঠানটির প্রধান অর্থ কর্মকর্তা মঈনুদ্দিন মোহাম্মদ রাহগীর জানিয়েছেন, বিকাশ ধারাবাহিকভাবে তাদের ব্যবসায়িক মডেলের স্থায়িত্ব ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। একই সঙ্গে তারা দেশের লাখো মানুষের জন্য আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক আর্থিক পরিবেশ গড়ে তুলতে কাজ করে যাচ্ছে।
তাঁর মতে, প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ, নিয়ন্ত্রক নীতিমালা মেনে চলা এবং সাইবার নিরাপত্তা জোরদার করার কারণে গ্রাহকদের আস্থা বেড়েছে। বর্তমানে বিপুলসংখ্যক গ্রাহক নিয়মিত লেনদেন করছেন, যা দেশের ডিজিটাল আর্থিক সেবার প্রতি মানুষের ক্রমবর্ধমান নির্ভরতারই প্রতিফলন।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে নগদবিহীন অর্থনীতির দিকে ধীরে ধীরে যে পরিবর্তন ঘটছে, বিকাশ তার অন্যতম বড় সুবিধাভোগী। বিশেষ করে মোবাইল ব্যাংকিং, অনলাইন কেনাকাটা, বিল পরিশোধ এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায় ডিজিটাল লেনদেনের বিস্তার প্রতিষ্ঠানটির আয় বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখছে।
মঈনুদ্দিন মোহাম্মদ রাহগীর আরও বলেন, ব্যবহারকারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং নিয়মিত লেনদেনই বিকাশের আয় ও মুনাফা বৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি। ভবিষ্যতেও ডিজিটাল কমার্স, পেমেন্ট সলিউশন এবং শক্তিশালী আর্থিক ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে প্রতিষ্ঠানটি বিনিয়োগ অব্যাহত রাখবে।
২০১০ সালে ব্র্যাক ব্যাংক এবং যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানি ইন মোশন এলএলসি’র যৌথ উদ্যোগে বিকাশ প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০১১ সালে বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করার পর দ্রুতই এটি দেশের সবচেয়ে বড় মোবাইল আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।
যদিও ২০১৯ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত বড় ধরনের প্রযুক্তিগত ও অবকাঠামোগত বিনিয়োগের কারণে প্রতিষ্ঠানটি লোকসানের মুখে পড়ে, তবে ২০২২ সালের জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিক থেকে আবারও মুনাফায় ফিরতে শুরু করে। এরপর থেকে ধারাবাহিকভাবে লাভ ধরে রেখেছে বিকাশ।
প্রতিষ্ঠানটির সাফল্যের পেছনে আরেকটি বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে তাদের বিনিয়োগ নীতিকে। শুরু থেকেই বিনিয়োগকারীরা ‘ধৈর্যশীল পুঁজি’ নীতি অনুসরণ করেছেন। অর্থাৎ, দ্রুত লভ্যাংশ নেওয়ার বদলে মুনাফার অর্থ আবারও ব্যবসায় বিনিয়োগ করা হয়েছে। এর ফলে বিকাশ শক্তিশালী প্রযুক্তিগত ভিত্তি গড়ে তুলতে এবং সেবার পরিধি দ্রুত বাড়াতে সক্ষম হয়েছে।
বর্তমানে বিকাশের ৫১ শতাংশ শেয়ার রয়েছে ব্র্যাক ব্যাংক-এর হাতে। এছাড়া অন্যান্য বিনিয়োগকারীদের মধ্যে রয়েছে মানি ইন মোশন এলএলসি, আলিপে সিঙ্গাপুর ই-কমার্স, ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স কর্পোরেশন এবং এসভিএফ ২ বিম (ডিই) এলএলসি।
বিকাশের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে তাদের গ্রাহক সংখ্যা ৮ কোটির বেশি এবং এজেন্ট রয়েছে প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার। বর্তমানে ক্যাশ আউটের ক্ষেত্রে প্রতি হাজার টাকায় ১৮ টাকা ৫০ পয়সা এবং অন্য অ্যাকাউন্টে অর্থ পাঠাতে প্রতি লেনদেনে ৫ টাকা চার্জ নেওয়া হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ডিজিটাল আর্থিক খাতের দ্রুত সম্প্রসারণ ভবিষ্যতে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আরও আনুষ্ঠানিক ও স্বচ্ছ ব্যবস্থার দিকে নিয়ে যেতে পারে। আর সেই পরিবর্তনের কেন্দ্রে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বিকাশ এখন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নাম।

