দেশের ব্যাংকিং খাতের প্রতি মানুষের আস্থার সংকট এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে অনেকেই নিজেদের সঞ্চয় ব্যাংকে না রেখে ঘরে বা ব্যক্তিগতভাবে সংরক্ষণ করছেন বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক ড. এ কে এনামুল হক। তাঁর মতে, ব্যাংক খাতে দীর্ঘদিনের অনিয়ম, ঋণ কেলেঙ্কারি এবং অর্থ পাচারের ঘটনাগুলো মানুষের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে, যার প্রভাব সরাসরি সঞ্চয় আচরণে পড়ছে।
রাজধানীর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে ‘অর্থনৈতিক রূপান্তর ও ব্যাংকিং খাত: বাজেট ২০২৬-২৭’ শীর্ষক এক আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান উন্নয়ন সমন্বয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
ড. এনামুল হক বলেন, দেশ থেকে যে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হয়েছে, তার বিনিময়ে দেশের ভেতরে সমপরিমাণ টাকার লেনদেন হয়েছে। সেই অর্থের একটি বড় অংশ আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ফিরে আসছে না। কারণ অনেক মানুষ ব্যাংকে অর্থ জমা রাখতে স্বস্তিবোধ করছেন না। ফলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ নগদ অর্থ ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে থেকে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, ব্যাংকের প্রতি আস্থাহীনতার পেছনে শুধু অর্থ পাচারই নয়, বরং জটিল নিয়ন্ত্রণ কাঠামো, কর ব্যবস্থার নানা চাপ এবং খেলাপি ঋণের লাগামহীন বৃদ্ধিও দায়ী। তাঁর মতে, যখন হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ অনাদায়ী থেকে যায় এবং এর জন্য কার্যকর জবাবদিহি দেখা যায় না, তখন সাধারণ আমানতকারীদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ তৈরি হয়।
আলোচনায় তিনি উল্লেখ করেন, দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বর্তমানে অত্যন্ত উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। এত বড় অঙ্কের অনাদায়ী ঋণ থাকা সত্ত্বেও দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা না নেওয়ায় মানুষের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে ব্যাংকারদেরও দায়বদ্ধতার আওতায় আনার প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
বিআইডিএস মহাপরিচালক আরও বলেন, ব্যাংকিং খাতে কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে। তিনি খাতভিত্তিক বিশেষায়িত ব্যাংক পুনর্গঠনের পরামর্শ দিয়ে বলেন, একসময় শিল্পায়ন ও নির্দিষ্ট অর্থনৈতিক খাতের উন্নয়নে বিশেষায়িত ব্যাংক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। কিন্তু নানা অনিয়ম ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে সেসব প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা নষ্ট হয়ে গেছে।
তাঁর মতে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এখনও বিশেষায়িত ব্যাংক সফলভাবে কাজ করছে এবং শিল্প, কৃষি বা অবকাঠামো উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। বাংলাদেশেও এ ধরনের প্রতিষ্ঠানকে নতুনভাবে শক্তিশালী করা হলে অর্থনীতির বিভিন্ন খাত উপকৃত হতে পারে।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্বকারী উন্নয়ন সমন্বয়ের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ড. এস এম জুলফিকার আলী বলেন, দেশের ব্যাংকিং খাত এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে যেখানে অনেক ক্ষেত্রে গ্রাহকেরা প্রয়োজনের সময় ব্যাংক থেকে সহজে অর্থ উত্তোলন করতে পারছেন না। ব্যাংকিং খাতে সুশাসন, জবাবদিহি এবং খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণের মতো মৌলিক বিষয়গুলো এখনও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।
আলোচনায় অংশ নেওয়া অর্থনীতি ও ব্যাংকিং খাতের বিশেষজ্ঞরা বলেন, ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা পুনরুদ্ধার করতে হলে শুধু নীতিগত ঘোষণা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন কঠোর তদারকি, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, বড় ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা গ্রহণ এবং আর্থিক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা।
বিশ্লেষকদের মতে, দেশের অর্থনীতিতে ব্যাংকিং খাতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ যদি ব্যাংকে অর্থ জমা রাখতে নিরুৎসাহিত হয়, তাহলে আমানত প্রবাহ কমে যাবে, ঋণ বিতরণে চাপ তৈরি হবে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ফলে ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি জনআস্থা পুনর্গঠন এখন শুধু আর্থিক খাতের নয়, পুরো অর্থনীতির জন্যই একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

