চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসেই ব্যাংক খাত থেকে সরকারের নিট ঋণ গ্রহণ নির্ধারিত বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। মূলত রাজস্ব আয় প্রত্যাশার তুলনায় কম হওয়ায় বাজেট ব্যয় মেটাতে সরকারকে ব্যাংক নির্ভরতা বাড়াতে হয়েছে বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন।
অর্থবছর ২০২৫–২৬-এ ব্যাংক খাত থেকে সরকার ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল। তবে ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত সময়ে বাস্তবে নেওয়া ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২৬ হাজার ১০২ কোটি টাকা। অর্থাৎ নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা বেশি ঋণ ইতোমধ্যেই নেওয়া হয়ে গেছে।
এর আগের বছরের একই সময়ে ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণ ছিল মাত্র ২৭ হাজার ৪০৩ কোটি টাকা। সেই তুলনায় এবার ঋণের পরিমাণ প্রায় চার গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা অর্থনীতিতে এক ধরনের চাপের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, রাজস্ব আহরণ প্রত্যাশা অনুযায়ী না বাড়ায় সরকার বাধ্য হয়ে ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নিচ্ছে। এক খ্যাতনামা গবেষণা সংস্থার একজন বিশিষ্ট ফেলো মনে করেন, সরকারের ব্যয় ও রাজস্ব আয়ের মধ্যে ভারসাম্য না থাকলেই এ ধরনের ঋণ নির্ভরতা তৈরি হয়। তিনি বলেন, রাজস্ব সংগ্রহ দুর্বল হলে বাজেট বাস্তবায়নে ব্যাংকিং খাতের ওপর চাপ বাড়ে।
ব্যাংক থেকে সরকারের অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণের ফলে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। কারণ ব্যাংকগুলোর তহবিলের একটি বড় অংশ সরকারী ঋণে চলে যায়, ফলে বেসরকারি উদ্যোক্তারা প্রয়োজনীয় অর্থ পেতে সমস্যায় পড়তে পারেন। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে বেসরকারি ঋণের চাহিদা তুলনামূলক কম থাকায় বড় ধরনের চাপ এখনো পুরোপুরি দেখা যায়নি বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত।
অন্যদিকে, রাজস্ব আদায়ের তথ্য অনুযায়ী চলতি অর্থবছরের প্রথম দশ মাসে কর কর্তৃপক্ষ প্রায় ৩ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করেছে, যা জুলাই–এপ্রিল সময়ের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা কম। এই ঘাটতিই মূলত সরকারের ঋণনির্ভরতা বাড়ানোর অন্যতম প্রধান কারণ।
একই সময়ে বৈদেশিক অর্থায়নও কমে এসেছে। আগের বছরের তুলনায় বিদেশি উৎস থেকে অর্থায়ন প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে, যা বাজেট ঘাটতি পূরণে ব্যাংক ঋণের ওপর চাপ আরও বাড়িয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের আরেকজন শীর্ষ পর্যায়ের বিশ্লেষক মনে করেন, ব্যাংক ঋণের এই দ্রুত বৃদ্ধি দেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তার মতে, এতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে যাচ্ছে, যা ইতোমধ্যে ইতিহাসে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে।
তিনি আরও বলেন, ব্যাংকগুলো বর্তমানে খেলাপি ঋণ ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় চাপের মধ্যে থাকায় তারা নিরাপদ বিকল্প হিসেবে সরকারকে বেশি ঋণ দিচ্ছে। এতে একদিকে ব্যাংকের আয় তুলনামূলক স্থিতিশীল হলেও অন্যদিকে অর্থনীতির উৎপাদনশীল খাতে অর্থপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই পরিস্থিতি একটি চক্র তৈরি করছে—যেখানে কম রাজস্ব আয় সরকারের ঋণ বাড়াচ্ছে, আর সেই ঋণ আবার বেসরকারি খাতের বিকাশকে সীমিত করছে। যদি এই চক্র ভাঙা না যায়, তাহলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বেসরকারি নেতৃত্বে এগিয়ে নেওয়া কঠিন হবে।
বিশ্লেষকদের কেউ কেউ সতর্ক করে বলেছেন, সরকার এখন ব্যয় বৃদ্ধির দিকে ঝুঁকছে, যা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা আরও কঠিন করে তুলতে পারে। তাদের মতে, ব্যয় ব্যবস্থাপনায় সতর্কতা এবং রাজস্ব আহরণ ব্যবস্থার কার্যকারিতা বাড়ানো এখন জরুরি।
অন্যদিকে বিকল্প অর্থায়ন হিসেবে অনুকূল পরিস্থিতিতে বৈদেশিক ঋণ নেওয়ার সুযোগ থাকলে তা বিবেচনা করার পরামর্শও দিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা।
সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, রাজস্ব ঘাটতি, ব্যাংক নির্ভরতা এবং বেসরকারি খাতে ঋণ সংকোচন—এই তিনটি বিষয় একত্রে দেশের অর্থনীতিতে নতুন চাপ তৈরি করছে, যা নীতিনির্ধারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সতর্ক সংকেত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

