ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি- দেশের অন্যতম বৃহৎ এবং একসময়ের সবচেয়ে লাভজনক ও আস্থাশীল এই আর্থিক প্রতিষ্ঠানটি আবারো সংবাদের শিরোনামে।
আজ ১ জুন, ২০২৬ তারিখে ঢাকার মতিঝিলে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে নতুন চেয়ারম্যান খুরশীদ আলমের পদত্যাগের দাবিতে সাধারণ গ্রাহকদের বিক্ষোভ এবং পুলিশের সাথে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।
গ্রাহকদের আশঙ্কা, নতুন এই নিয়োগ ব্যাংকের তারল্য সংকট ও আস্থাহীনতাকে আরও বাড়িয়ে তুলবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—ইসলামী ব্যাংকে এত সমস্যা কেন? আজকের এই পরিস্থিতি কি হঠাৎ তৈরি হয়েছে, নাকি এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত অনিয়ম?
আবারো আলোচনায় ইসলামী ব্যাংক: আস্থার সংকট ও পুঞ্জীভূত অনিয়মের ব্যবচ্ছেদ
পটভূমি: সুশাসন থেকে পতনের সূচনা (২০১৭ সালের ‘অনাকাঙ্ক্ষিত’ পরিবর্তন)
ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান সংকটের গোড়াপত্তন হয়েছিল ২০১৭ সালে। সেই বছর এক রাতের ব্যবধানে এক প্রকার জোরপূর্বক ব্যাংকের তৎকালীন পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে পরিবর্তন করা হয়।
-
এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণ: চট্টগ্রামের বিতর্কিত ব্যবসায়ী গোষ্ঠী ‘এস আলম গ্রুপ’ বিভিন্ন নামে-বেনামে ও ভুয়া প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংকের সিংহভাগ শেয়ার কিনে নেয় এবং ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণ নিজেদের হাতে তুলে নেয়।
-
লুটপাট ও বেনামী ঋণ: ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে এই গ্রুপটি ব্যাংক থেকে নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে হাজার হাজার কোটি টাকা বেনামী ঋণের নামে তুলে নেয়। দেশের ইতিহাসে এটিকে ব্যাংকিং খাতের অন্যতম বৃহৎ ‘আর্থিক কেলেঙ্কারি’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
-
তারল্য সংকট: বিপুল পরিমাণ টাকা ব্যাংক থেকে বের হয়ে যাওয়ায় সাধারণ গ্রাহকদের চেকের টাকা দিতে ও এটিএম বুথে নগদ টাকার জোগান দিতে ব্যাংকটি হিমশিম খেতে শুরু করে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ তারল্য সহায়তায় কোনোমতে ব্যাংকটি টিকে ছিল।
৫ আগস্ট ২০২৪-এর পটপরিবর্তন ও সংস্কারের চেষ্টা
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও পুনর্গঠিত বাংলাদেশ ব্যাংক ইসলামী ব্যাংককে এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণমুক্ত করার উদ্যোগ নেয়। কিন্তু তৎকালীন সরকার ১৮ মাসে অর্থনীতির চাকা ঘুরাতে ব্যর্থ হয়েছেন।
-
পর্ষদ ভেঙে দেওয়া: এস আলমের মনোনীত পরিচালকদের সরিয়ে নতুন স্বতন্ত্র পরিচালনা পর্ষদ গঠন করা হয়।
-
কর্মকর্তাদের ক্ষোভ: দীর্ঘদিনের বঞ্চিত কর্মকর্তারা ব্যাংকের ভেতরে আন্দোলন শুরু করেন এবং এস আলমের সহযোগীদের চিহ্নিত করে বের করে দেওয়ার দাবি জানান।
-
বর্তমান চেয়ারম্যান বিতর্ক: আজ ১ জুন, ২০২৬-এ যে খুরশীদ আলমের যোগদানের কথা ছিল, তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর। ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ঠিক পর পরই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভেতরে কর্মকর্তাদের তীব্র আন্দোলনের মুখে তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, খুরশীদ আলম সেই বিতর্কিত এস আলম গ্রুপের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন। ফলে তাকে পুনরায় চেয়ারম্যান করায় গ্রাহক ও শেয়ারহোল্ডাররা ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন।
বর্তমান অবস্থার বিশ্লেষণ: কেন কাটছে না সংকট?
আজকের সংঘর্ষ এবং গ্রাহকদের বিক্ষোভের নেপথ্যে কয়েকটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও আর্থিক কারণ রয়েছে:
ক) চরম আস্থার সংকট (Trust Deficit)
ব্যাংকিং খাত চলে বিশ্বাসের ওপর। ২০১৭ সালের পর থেকে সাধারণ আমানতকারীদের মনে যে ভীতি তৈরি হয়েছিল, তা এখনো কাটেনি। গ্রাহকদের আশঙ্কা, এস আলম গ্রুপের সাথে সংশ্লিষ্ট কেউ যদি পুনরায় নেতৃত্বে আসেন, তবে ব্যাংকের তহবিল এবং তাদের আমানত আবারও ঝুঁকির মুখে পড়বে।
খ) তারল্য সংকট ও গ্রাহক ভোগান্তি
আজকের বিক্ষোভকারীদের অন্যতম বড় অভিযোগ ছিল ব্যাংকের বর্তমান তারল্য পরিস্থিতি। অনেক গ্রাহকই চেকের মাধ্যমে বা এটিএম বুথ থেকে টাকা তুলতে গিয়ে সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। ব্যাংকের তারল্য ঘাটতি এখনো পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি, যার ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ প্রতিনিয়ত বাড়ছে।
গ) নীতি নির্ধারণে দূরদর্শিতার অভাব
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক একজন বিতর্কিত কর্মকর্তাকে, যিনি নিজেই কিছুদিন আগে আন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করেছিলেন, দেশের এত বড় একটি ব্যাংকের চেয়ারম্যান করার সিদ্ধান্তটি কৌশলগতভাবে ভুল ছিল বলে মনে করছেন ব্যাংকিং খাতের পর্যবেক্ষকরা। আন্দোলনকারীদের শান্ত করার পরিবর্তে প্রথম দিনেই পুলিশি অ্যাকশন (টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড, জলকামান) পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
পর্যবেক্ষকদের মতামত ও ভবিষ্যৎ করণীয়
ব্যাংক খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, ইসলামী ব্যাংক শুধু একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান নয়, এর সাথে দেশের কোটি মানুষের আবেগ ও শরীয়াহভিত্তিক ব্যাংকিংয়ের বিশ্বাস জড়িত। এই সংকট কাটাতে হলে:
-
স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা: নতুন চেয়ারম্যানের নিয়োগ কেন এবং কোন প্রক্রিয়ায় হলো, তার স্পষ্ট ও যৌক্তিক ব্যাখ্যা অবিলম্বে বাংলাদেশ ব্যাংক ও ইসলামী ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে দিতে হবে।
-
গ্রাহকের স্বার্থ রক্ষা: যেকোনো মূল্যে সাধারণ আমানতকারীদের টাকা তোলার নিশ্চয়তা এবং এটিএম বুথ সচল রাখতে হবে।
-
বিতর্কমুক্ত নেতৃত্ব: ব্যাংকের শীর্ষ পদে এমন ব্যক্তিদের বসাতে হবে যাদের সততা, পেশাদারিত্ব এবং নিরপেক্ষতা নিয়ে সাধারণ গ্রাহক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মনে কোনো প্রশ্ন থাকবে না।
পরিশেষে, মতিঝিলের আজকের থমথমে পরিস্থিতি ও শতাধিক আহতের ঘটনা দেশের পুরো ব্যাংক পাড়াকেই এক ধরনের বার্তা দিচ্ছে। জোর খাটানো বা অতিরিক্ত পুলিশি শক্তি প্রয়োগ করে গ্রাহকদের মনের ‘আস্থার সংকট’ দূর করা যাবে না। যদি দ্রুত কার্যকর যোগাযোগ এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা না যায়, তবে এই অনিশ্চয়তা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

