ইরানের সামরিক কৌশল নিয়ে সাম্প্রতিক একটি ভিডিওতে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনা হয়েছে- কোনো দেশের সর্বোচ্চ সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বকে সরিয়ে দেওয়া হলেও সেই দেশের সামরিক বাহিনী কি যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারে?
ভিডিওটির বক্তা গৃহা আতুলের দাবি, ইরান বহু বছর ধরে এমন একটি সামরিক কাঠামো তৈরি করেছে, যার মাধ্যমে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ওপর হামলা হলেও যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব। এই ধারণার পেছনে রয়েছে ইরানের বহুল আলোচিত ‘Mosaic Defense’ বা ‘মোজাইক প্রতিরক্ষা’ কৌশল।
‘মোজাইক ডিফেন্স’ কী?
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা IRGC ২০০৫ সালের দিকে একটি নমনীয় ও স্তরভিত্তিক প্রতিরক্ষা ধারণা গ্রহণ করে, যাকে ‘Mosaic Defense’ বলা হয়। এর অন্যতম স্থপতি ছিলেন তৎকালীন IRGC কৌশলগত কেন্দ্রের প্রধান জেনারেল মোহাম্মদ আলী জাফারি।
এই ব্যবস্থার মূল ধারণা হলো সামরিক কমান্ডকে পুরোপুরি একটি কেন্দ্রের ওপর নির্ভরশীল না রেখে বিভিন্ন আঞ্চলিক কাঠামোর মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া। ফলে রাজধানী বা কেন্দ্রীয় কমান্ড আক্রান্ত হলেও স্থানীয় পর্যায়ের বাহিনী প্রতিরোধ চালিয়ে যেতে পারে।
পরবর্তীতে IRGC-এর কাঠামোতে প্রাদেশিক কমান্ড গড়ে তোলা হয়। বিভিন্ন গবেষণায় ৩১টি প্রাদেশিক কমান্ড এবং তেহরানকে ঘিরে পৃথক কমান্ড কাঠামোর কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

কেন এই কাঠামো তৈরি করা হয়েছিল?
ইরানের সামরিক পরিকল্পনাকারীরা মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মতো প্রযুক্তিগত ও বিমানশক্তিতে এগিয়ে থাকা প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে প্রচলিত যুদ্ধের সীমাবদ্ধতা বুঝেছিল।
তাদের আশঙ্কা ছিল, একটি প্রচলিত ‘কেন্দ্রীয়’ সামরিক কাঠামোর ওপর ব্যাপক বিমান হামলা বা নেতৃত্ব-ধ্বংসকারী হামলা চালানো হলে কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা দ্রুত অকার্যকর হয়ে যেতে পারে।
তাই ‘মোজাইক’ ধারণায় একটি বড় সামরিক কাঠামোকে অনেকগুলো তুলনামূলকভাবে স্বনির্ভর অংশে ভাগ করার চিন্তা করা হয়। গবেষণায় বলা হয়েছে, কেন্দ্রীয় কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ভেঙে পড়লেও স্থানীয় ইউনিটগুলো যেন প্রতিরোধ চালিয়ে যেতে পারে—এটাই ছিল এই ব্যবস্থার অন্যতম উদ্দেশ্য।
‘মাথাবিহীন সেনাবাহিনী’—কথাটি কতটা সঠিক?
ভিডিওর সবচেয়ে আকর্ষণীয় বক্তব্য হলো—ইরান এমন একটি সামরিক ব্যবস্থা তৈরি করেছে, যা ‘মাথা ছাড়াই’ যুদ্ধ করতে পারে।
তবে এটিকে আক্ষরিক অর্থে ‘মাথাবিহীন সেনাবাহিনী’ বলা কিছুটা অতিরঞ্জিত। বাস্তবে ইরানের সামরিক কাঠামো পুরোপুরি নেতৃত্বহীন নয়। কেন্দ্রীয় কমান্ড, IRGC নেতৃত্ব এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব এখনো গুরুত্বপূর্ণ।
বরং ‘Mosaic Defense’-এর সঠিক ব্যাখ্যা হলো decentralized বা বিকেন্দ্রীভূত কমান্ড কাঠামো। অর্থাৎ কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলেও স্থানীয় কমান্ডারদের হাতে নির্দিষ্ট মাত্রায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা থাকে। Brookings-এর বিশ্লেষণেও এই কাঠামোর উদ্দেশ্য হিসেবে স্থানীয় পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে হামলার পরও কাঠামো টিকিয়ে রাখার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।
এর সামরিক সুবিধা কোথায়?
এই ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো resilience বা টিকে থাকার সক্ষমতা।
একটি কেন্দ্রীয় কমান্ড ধ্বংস হলে পুরো বাহিনী অচল হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। কিন্তু বিকেন্দ্রীভূত ব্যবস্থায় একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও অন্য অংশগুলো কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারে।
ইরানের ভৌগোলিক অবস্থানও এই কৌশলকে সহায়তা করে। দেশটির বিস্তীর্ণ ভূখণ্ড, পাহাড়ি এলাকা এবং দীর্ঘ যোগাযোগপথ দীর্ঘস্থায়ী ও স্তরভিত্তিক প্রতিরোধের সুযোগ তৈরি করে।
এ কারণে ইরানের কৌশল প্রচলিত অর্থে দ্রুত একটি যুদ্ধ ‘জেতার’ চেয়ে প্রতিপক্ষের জন্য যুদ্ধকে দীর্ঘ, ব্যয়বহুল ও অনিশ্চিত করে তোলার দিকে বেশি মনোযোগী।
এর দুর্বলতাও আছে
তবে বিকেন্দ্রীভূত সামরিক কাঠামো মানেই অজেয় সামরিক ব্যবস্থা নয়।
কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলে স্থানীয় ইউনিটগুলো টিকে থাকতে পারে—কিন্তু একই সঙ্গে সমন্বয়, গোয়েন্দা তথ্যের আদান-প্রদান, রসদ সরবরাহ এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশল নির্ধারণ কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
এ কারণেই বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষণে ‘Mosaic Defense’-কে সম্পূর্ণ স্বাধীন সামরিক ইউনিটের সমষ্টি হিসেবে দেখার ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছে। কিছু গবেষণায় বলা হয়েছে, কাঠামোটি বিকেন্দ্রীভূত হলেও কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ও তদারকি পুরোপুরি বিলীন হয়ে যায় না।
ভিডিওর মূল বক্তব্যের একটি শক্ত তথ্যভিত্তিক ভিত্তি রয়েছে। ইরানের ‘Mosaic Defense’ বাস্তবেই একটি প্রতিষ্ঠিত সামরিক ধারণা এবং এটি কেন্দ্রীয় কমান্ড ক্ষতিগ্রস্ত হলেও প্রতিরোধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে তৈরি হয়েছিল।
তবে গৃহা আতুলের বক্তব্যে বলা হয়েছে যে প্রতিটি প্রাদেশিক ইউনিট সম্পূর্ণ স্বাধীন, নিজস্ব অস্ত্রভাণ্ডারসহ কেন্দ্রের কোনো নির্দেশ ছাড়াই যেকোনো সময় যুদ্ধ চালাতে পারে—তাহলে সেটিকে সরলীকৃত বা অতিরঞ্জিত ব্যাখ্যা হিসেবে দেখা উচিত। বাস্তব কাঠামোতে স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন থাকলেও IRGC-এর সামগ্রিক কমান্ড কাঠামো বিদ্যমান।
কেন বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ?
আধুনিক যুদ্ধে ‘decapitation strike’ বা শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে হামলা একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল। কিন্তু ইরানের ‘Mosaic Defense’ দেখায়, একটি রাষ্ট্র বহু আগে থেকেই যদি নেতৃত্ব-নির্ভরতার ঝুঁকি কমিয়ে রাখে, তাহলে শীর্ষ পর্যায়ে ব্যাপক ক্ষতি হলেও সামরিক প্রতিরোধ অব্যাহত থাকতে পারে।
এখানেই গৃহা আতুলের বক্তব্যের গুরুত্ব। ইরানের শক্তি শুধু ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন বা সামরিক সরঞ্জামে নয়; বরং তার একটি বড় শক্তি হলো যুদ্ধের কাঠামোকে এমনভাবে সাজানো, যাতে কেন্দ্র আক্রান্ত হলেও পুরো ব্যবস্থা একসঙ্গে ভেঙে না পড়ে।
অর্থাৎ, ইরানের ‘মোজাইক ডিফেন্স’কে সবচেয়ে ভালোভাবে বোঝানো যায় এভাবে “একটি মাথা কেটে দিলে যেন পুরো শরীর অচল না হয়ে যায় – সেই হিসাবেই তৈরি করা প্রতিরক্ষা কাঠামো।”
তবে এটিকে অজেয় বা সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় সামরিক ব্যবস্থা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে নেতৃত্ব, যোগাযোগ, রসদ, গোয়েন্দা সক্ষমতা এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক ইউনিটের মধ্যে সমন্বয় কতটা বজায় থাকে তার ওপর।

