দেশের ব্যাংক খাতের ভঙ্গুর অবস্থা এখন অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের মূল্যায়নে উঠে এসেছে। উচ্চ প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতি ও ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ার যে লক্ষ্য সরকার ঘোষণা করেছে, তা বাস্তবায়ন নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের অর্থনীতি মূলত ব্যাংকনির্ভর হওয়ায় এ খাত দুর্বল থাকলে পুরো অর্থনীতিই ঝুঁকির মুখে পড়ে। বর্তমানে ব্যাংক খাতের সম্পদ দেশের মোট জিডিপির প্রায় অর্ধেকের সমান এবং এর বড় অংশই ঋণ ও বিনিয়োগ নির্ভর। ফলে ব্যাংকগুলোর সক্ষমতা কমে গেলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যায়, বিনিয়োগ স্থবির হয় এবং কর্মসংস্থানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বিপুলভাবে বেড়ে ৬ লাখ কোটি টাকারও বেশি হয়েছে, যা মোট ঋণের একটি বড় অংশ। একই সঙ্গে মূলধন পর্যাপ্ততার হার নেতিবাচক পর্যায়ে নেমে এসেছে বলে অর্থনীতিবিদরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে যাওয়াও এই দুর্বলতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এমন পরিস্থিতি দীর্ঘদিন চলতে থাকলে বিনিয়োগ পরিকল্পনা, রাজস্ব সংগ্রহ এবং সরকারি উন্নয়ন ব্যয়—সব ক্ষেত্রেই চাপ তৈরি হয়। বাজেট ঘাটতি পূরণে সরকার ব্যাংক খাতের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় সংকট আরও গভীর হয়।
বিশ্লেষণে আরও বলা হচ্ছে, ব্যাংক খাতের বর্তমান অবস্থার সঙ্গে আন্তর্জাতিক গবেষণায় চিহ্নিত “গুরুতর ব্যাংকিং সংকট”-এর অনেক মিল রয়েছে। অতীত অভিজ্ঞতা দেখায়, এমন সংকট দীর্ঘ হলে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হ্রাস, কর্মসংস্থান সংকোচন এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য বৃদ্ধি পায়।
দেশের রাষ্ট্রমালিকানাধীন ও বেসরকারি উভয় ব্যাংক খাতেই দুর্বলতার চিত্র স্পষ্ট। কিছু ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ খেলাপি ঋণ, তারল্য সংকট এবং মূলধন ঘাটতির চাপে রয়েছে। এর মধ্যে বড় কয়েকটি ব্যাংকের দুর্বলতা পুরো আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংক ঘিরে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দেওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। আমানতকারীদের আস্থা কমে যাওয়ায় অর্থ উত্তোলনের চাপ তৈরি হয়েছে, যা তারল্য সংকটকে তীব্র করছে। এ অবস্থায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক জরুরি সহায়তা দিলেও সেটি সাময়িক সমাধান হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, মূল সমস্যা সমাধানে ব্যাংক খাতকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা এবং কাঠামোগত সংস্কার জরুরি। শুধু তারল্য সহায়তা বা স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপ দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা আনা সম্ভব নয়।
তাদের মতে, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, দুর্বল ব্যাংক পুনর্গঠন, শক্তিশালী তদারকি ব্যবস্থা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা নিশ্চিত না করা গেলে সংকট আরও গভীর হবে। পাশাপাশি ব্যাংক খাতে আস্থা পুনরুদ্ধার না হলে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ার সম্ভাবনাও ক্ষীণ।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, সময়মতো কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে এই দুর্বলতা পুরো অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। ফলে উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন আরও কঠিন হয়ে পড়বে এবং দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাও হুমকির মুখে পড়বে।

