ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির পল্লী উন্নয়ন কর্মসূচি (আরডিএস) নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া এক বক্তব্যে দাবি করা হয়, এই প্রকল্পের মাধ্যমে মোট ২২ হাজার কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে। তবে ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রকল্পটির অধীনে চলমান বিনিয়োগ বা ঋণের পরিমাণ ৬ হাজার ৮৮০ কোটি টাকা। এই দুই অঙ্কের বড় পার্থক্য ঘিরেই প্রশ্ন উঠেছে—আসলে কোন হিসাবটি সঠিক এবং ২২ হাজার কোটি টাকার দাবি কোন ভিত্তিতে করা হয়েছে?
সাম্প্রতিক সময়ে আরডিএস কর্মসূচি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসে। সংসদে আলোচনার সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, নির্বাচনের আগে এবং পরে প্রকল্পটির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিতরণ হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, নির্বাচনের আগে ১১ হাজার কোটি এবং পরে আরও ১১ হাজার কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে। এ বক্তব্য প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।
অন্যদিকে ইসলামী ব্যাংকের প্রকাশিত তথ্য বলছে, ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত আরডিএসের আওতায় সক্রিয় গ্রাহকের সংখ্যা ৮ লাখ ৫৩ হাজার ৫৯২ জন। বর্তমানে এই প্রকল্পে মোট বিনিয়োগ স্থিতি রয়েছে ৬ হাজার ৮৮০ কোটি টাকা। একই সময়ে গ্রাহকদের সঞ্চয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২৬৯ কোটি টাকা। আদায়ের হারও ৯৬ দশমিক ৪৮ শতাংশ, যা ক্ষুদ্র অর্থায়ন খাতের জন্য উল্লেখযোগ্য বলে বিবেচিত হয়।
ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ‘বিতরণ’ এবং ‘ঋণ স্থিতি’—এই দুই ধরনের হিসাবের পার্থক্য বোঝা। একটি ক্ষুদ্র অর্থায়ন প্রকল্পে গ্রাহক ঋণ নেওয়ার পর কিস্তির মাধ্যমে তা পরিশোধ করেন। পরে সেই অর্থ আবার নতুন গ্রাহকের কাছে ঋণ হিসেবে বিতরণ করা হয়। ফলে একই টাকা বছরের মধ্যে একাধিকবার ঘুরে ব্যবহার হতে পারে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৩ সালে আরডিএসের মাধ্যমে প্রায় ৭ হাজার ৪৮৪ কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছিল। ওই বছরেই আদায় হয় প্রায় ৬ হাজার ৬৯৮ কোটি টাকা। ২০২৪ সালে বিতরণ করা হয় ৬ হাজার ৮৭২ কোটি টাকা এবং আদায় হয় ৬ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা। ২০২৫ সালে বিতরণ হয় ৬ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা, যার মধ্যে ৬ হাজার ৭৭৬ কোটি টাকা ফেরত আসে। চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে আরও ২ হাজার ৭৪৩ কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে এবং এর বিপরীতে আদায় হয়েছে ২ হাজার ৬৫২ কোটি টাকা।
এই চার সময়কালের মোট বিতরণ হিসাব করলে পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ২৩ হাজার ৯৫১ কোটি টাকা। অর্থাৎ কয়েক বছরের সামগ্রিক বিতরণ বিবেচনায় নিলে ২২ হাজার কোটি টাকার মতো অঙ্ক পাওয়া সম্ভব। তবে সেই অর্থ বর্তমানে গ্রাহকদের কাছে বকেয়া বা চলমান ঋণ হিসেবে নেই। কারণ এর বড় অংশ ইতোমধ্যে পরিশোধ হয়ে আবার নতুনভাবে বিতরণ করা হয়েছে।
ব্যাংকিং বিশ্লেষকদের মতে, বিতরণকৃত মোট অর্থ এবং একটি নির্দিষ্ট সময়ে বিদ্যমান ঋণ স্থিতিকে এক করে দেখলে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। তাদের ভাষায়, একটি প্রকল্পের বর্তমান আকার বোঝাতে সাধারণত ‘ঋণ স্থিতি’ বা ‘বিনিয়োগ স্থিতি’ ব্যবহার করা হয়। আর কয়েক বছরের কার্যক্রমের পরিধি বোঝাতে ব্যবহার করা হয় ‘মোট বিতরণ’ তথ্য।
নির্বাচন ঘিরে বিতরণের বিষয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ইসলামী ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চার মাসে মোট ২ হাজার ৩৬২ কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে। একই সময়ে আদায় হয়েছে ২ হাজার ২১১ কোটি টাকা। ব্যাংকের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এই সময়কালে ১১ হাজার কোটি টাকা বিতরণের কোনো তথ্য পাওয়া যায় না।
অর্থনীতি ও ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, বিতর্ক নিরসনের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রয়োজন। বিশেষ করে ২২ হাজার কোটি টাকার দাবিটি কোন সময়কাল, কোন তথ্যভিত্তি এবং কোন উৎস থেকে এসেছে, তা স্পষ্ট করা হলে জনমনে তৈরি হওয়া বিভ্রান্তি দূর হবে।
বর্তমান তথ্য-উপাত্ত বলছে, আরডিএস প্রকল্পে চলমান বিনিয়োগের পরিমাণ ৬ হাজার ৮৮০ কোটি টাকা। তবে কয়েক বছরের মোট বিতরণ যোগ করলে তা ২২ হাজার কোটি টাকারও বেশি হতে পারে। ফলে মূল বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একই প্রকল্পের দুটি ভিন্ন আর্থিক সূচক—‘মোট বিতরণ’ এবং ‘বর্তমান ঋণ স্থিতি’। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, এই পার্থক্য পরিষ্কারভাবে তুলে ধরলেই আলোচনার বড় অংশের সমাধান হতে পারে।

