ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। চেয়ারম্যানসহ সব পরিচালকের নিয়োগ বাতিল করে ব্যাংকটির পরিচালনাগত দায়িত্ব কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জহির হোসেনের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে।
আজ রোববার রাতে বাংলাদেশ ব্যাংক এ-সংক্রান্ত একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। এতে বলা হয়, ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৪৫ ধারা ও ৪৭(৩) ধারায় অর্পিত ক্ষমতা প্রয়োগ করে এবং ব্যাংক, আমানতকারী ও জনস্বার্থ বিবেচনায় ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যানসহ সব পরিচালকের নিয়োগ বাতিল করা হয়েছে।
একই সঙ্গে আইনের ৪৭(৩) ধারা অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জহির হোসেনকে পরিচালনা পর্ষদের সব ক্ষমতা প্রয়োগ ও দায়িত্ব পালনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত তিনি ব্যাংকটির পর্ষদের দায়িত্ব পালন করবেন।
ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যানসহ পাঁচজন পরিচালকই ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়োগপ্রাপ্ত স্বতন্ত্র পরিচালক। গত ২৪ মে ব্যাংকটির তৎকালীন চেয়ারম্যান এম জুবায়দুর রহমান পদত্যাগ করেন। পরে একই দিন রাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর মো. খুরশীদ আলমকে স্বতন্ত্র পরিচালক ও চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
তবে নতুন চেয়ারম্যানের নিয়োগের পর নানা বিতর্ক তৈরি হয়। তাঁর অপসারণসহ সাত দফা দাবিতে ‘সচেতন গ্রাহক ফোরাম’-এর ব্যানারে কিছু গ্রাহক আন্দোলন শুরু করেন। বিষয়টি জাতীয় সংসদেও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয় এবং সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে তীব্র বিতর্ক দেখা দেয়।
পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটে যখন রাজধানীর দিলকুশায় ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ধারাবাহিক বিক্ষোভ শুরু হয়। এ সময় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীও গ্রাহকদের দাবির প্রতি সমর্থন জানায়। এসব ঘটনার প্রভাবে সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে আমানত তুলে নেওয়ার প্রবণতা বাড়তে থাকে। ফলে ব্যাংকটি তারল্যসংকটে পড়ে এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ১০ হাজার কোটি টাকা সহায়তা চায়।
এরই মধ্যে রোববার সকালে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইসলামী ব্যাংককে আড়াই হাজার কোটি টাকা ঋণ দেয়।
একই দিন বিকেলে ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, দুই অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং ছয়জন উপব্যবস্থাপনা পরিচালক বাংলাদেশ ব্যাংকে গিয়ে গভর্নর মোস্তাকুর রহমানসহ শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক বার্তায় জানানো হয়, ব্যাংকের কর্মকর্তারা চলমান পরিস্থিতি সম্পর্কে গভর্নরকে অবহিত করেন।
বৈঠক শেষে ইসলামী ব্যাংকের চলতি দায়িত্বে থাকা ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলতাফ হোসেন বলেন, গ্রাহকদের টাকা উত্তোলনে যে সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে, তা দ্রুত স্বাভাবিক হবে। ব্যাংকের তারল্য পরিস্থিতি উন্নত করতে এবং লেনদেন সচল রাখতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে বর্তমান তহবিল ব্যবস্থাপনা, আর্থিক অবস্থা এবং সামনের দিনের পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
আলতাফ হোসেনের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই দিনে ব্যাংকটিতে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা জমা হয়েছে এবং প্রায় একই পরিমাণ অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে। ফলে নগদ জমা ও উত্তোলনের পরিমাণ বর্তমানে প্রায় সমতা অবস্থায় রয়েছে।
দিনভর আলোচনার পর রাতে বাংলাদেশ ব্যাংক ইসলামী ব্যাংকের পুরো পরিচালনা পর্ষদ বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন শীর্ষ কর্মকর্তার নেতৃত্বে ব্যাংকটির কার্যক্রম পরিচালনার ব্যবস্থা করা হয়। আপাতত তাঁর তত্ত্বাবধানেই পরিচালিত হবে দেশের অন্যতম বৃহৎ এই ইসলামী ব্যাংক।

