দুর্বল ও সংকটাপন্ন ব্যাংকগুলোকে সরকারি অর্থ দিয়ে পুনরুজ্জীবিত করার পরিকল্পনার আগে ব্যাংক খাত থেকে আত্মসাৎ হওয়া অর্থ উদ্ধার এবং দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার দাবি তুলেছেন ব্যাংক মালিকরা। তাদের মতে, শুধু বিপুল পরিমাণ অর্থ ঢেলে ব্যাংকগুলোকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করলে সাময়িক স্বস্তি মিলতে পারে, কিন্তু এতে খাতটির গভীর সংকটের স্থায়ী সমাধান হবে না।
ব্যাংক খাতের উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি) ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে দেওয়া এক প্রতিক্রিয়ায় এ অবস্থান তুলে ধরেছে। সংগঠনটি বলেছে, দুর্বল ব্যাংকগুলোকে সহায়তার জন্য সরকার যে বিপুল অর্থ বরাদ্দের পরিকল্পনা করেছে, তার আগে ব্যাংক খাতে সংঘটিত অনিয়ম, ঋণ জালিয়াতি এবং অর্থ পাচারের ঘটনাগুলোর কার্যকর তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বিএবির মতে, দীর্ঘদিন ধরে কিছু ব্যাংকে পরিচালনাগত দুর্বলতা, রাজনৈতিক প্রভাব, ঋণ বিতরণে অনিয়ম এবং ইচ্ছাকৃত খেলাপির কারণে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তার দায় সাধারণ জনগণের কাঁধে চাপানো উচিত নয়। বরং যাদের কর্মকাণ্ডের কারণে ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত্তি দুর্বল হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা গ্রহণ করাই হওয়া উচিত সরকারের অগ্রাধিকার।
সংগঠনটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ব্যাংক খাতের প্রতি জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আমানতকারীরা তখনই স্বস্তি অনুভব করবেন, যখন তারা দেখবেন অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। অন্যথায় সরকারি অর্থ দিয়ে পুনঃমূলধনীকরণ করা হলেও আস্থার সংকট পুরোপুরি কাটবে না।
বিএবি মনে করে, ব্যাংক খাতে জমে থাকা বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ এবং সমস্যাগ্রস্ত সম্পদ ব্যবস্থাপনায় একটি বিশেষায়িত কাঠামো প্রয়োজন। এজন্য তারা একটি সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি বা অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি গঠনের সুপারিশ করেছে। এই প্রতিষ্ঠান দুর্বল ঋণ ও অকার্যকর সম্পদ পৃথকভাবে পরিচালনা করে ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থান পুনর্গঠনে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।
তাদের মতে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ব্যাংক খাতের সংকট মোকাবিলায় এ ধরনের প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু প্রস্তাবিত বাজেটে এমন কোনো উদ্যোগের জন্য স্পষ্ট বরাদ্দ বা নীতিগত দিকনির্দেশনা না থাকাকে একটি অপূর্ণতা হিসেবে দেখছে সংগঠনটি।
ব্যাংক মালিকদের সংগঠন আরও বলেছে, ভবিষ্যতে যাতে একই ধরনের সংকট পুনরায় সৃষ্টি না হয়, সেজন্য নতুন ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ কাঠামোতে কঠোর সুরক্ষা ব্যবস্থা থাকতে হবে। বিশেষ করে যেসব ব্যক্তি বা গোষ্ঠী অনিয়ম, ঋণ কেলেঙ্কারি বা আর্থিক দুর্নীতির মাধ্যমে কোনো ব্যাংককে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে, তারা যেন পুনরায় ব্যাংকিং খাতে প্রভাব বিস্তার করতে না পারে, তা নিশ্চিত করা জরুরি।
অর্থনীতিবিদদের একটি অংশও মনে করেন, ব্যাংক খাতের সংকটের মূল কারণগুলো সমাধান না করে শুধু অর্থ সহায়তা দেওয়া হলে সমস্যার পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে। তাদের মতে, পুনঃমূলধনীকরণের পাশাপাশি ঋণ পুনরুদ্ধার, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, পরিচালনা পর্ষদের জবাবদিহি এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকারিতা বাড়ানো সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমানে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ, মূলধন ঘাটতি এবং তারল্য সংকট নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। এ অবস্থায় সরকার দুর্বল ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী করতে সহায়তার পরিকল্পনা করছে। তবে এ উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে, তা অনেকাংশে নির্ভর করবে অনিয়মে জড়িতদের বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয় এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থায় কতটা সংস্কার আনা সম্ভব হয় তার ওপর।
বিশ্লেষকদের মতে, শুধু সরকারি অর্থ দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকগুলোকে টিকিয়ে রাখা নয়, বরং কেন সেই ব্যাংকগুলো দুর্বল হয়ে পড়ল এবং কারা এর জন্য দায়ী—সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করাও সমান জরুরি। কারণ জবাবদিহিহীন উদ্ধার কর্মসূচি ভবিষ্যতে আরও বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে অর্থ সহায়তার পাশাপাশি সুশাসন, স্বচ্ছতা এবং দায়বদ্ধতাভিত্তিক সংস্কারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার বিকল্প নেই।

